Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কার্যকর আয়কর আইন ২০২৩ নিশ্চয়নে

আয়কর আইন কার্যকরের জন্য সরকারের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ উভয়ই প্রয়োজনীয়

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫৫ পিএম

আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ বাতিল করে গত বছরের ২২ জুন নতুন আয়কর আইন অনুমোদন দেয় জাতীয় সংসদ। এই পরিবর্তন করদান ত্বরান্বিত করতে, করদাতাদের আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি একটি ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দেয়। সুনির্দিষ্ট ৩৪৫টি ধারা সন্নিবেশিত আয়কর আইন ২০২৩-এ আটটি তফসিল ও সংযুক্ত করা হয়েছে।

মৌলিক বৈশিষ্ট্য

উন্নতি ও পরিবর্তন: সংশোধিত আয়কর আইন ২০২৩ দেশের প্রথম আয়কর আইন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এটির মাধ্যমে করদান প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

করদাতাদের সম্মতি: প্রতিটি ধারা ও অংশে করদাতাদের সম্মতি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সুবিধাজনক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ন্যায্যতা ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা: এতে সুনির্দিষ্ট ধারা এবং অংশ সংযুক্ত করা হয়েছে। যাতে করা ব্যবস্থায় ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা সম্পন্ন হতে পারে।

বিস্তারিত পরিবর্তন ও বর্ধিতকরণ

এই নতুন আইনে মোট ২৫টি অংশ এবং ৩৪৫টি ধারা সন্নিবেশিত রয়েছে। এটি জাতীয় সংসদে প্রথম আয়কর আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুধু তাই নয় তফসিল ও সংযুক্তি এই আইনের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং বৈশিষ্ট্যগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে।

নতুন আয়কর আইন ২০২৩ প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার উন্নয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রসর হয়েছে। রাজস্ব সংহতি এবং কর সম্মতি বৃদ্ধি করবে বলেও আশা করা হচ্ছে, উভয়ই দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে উন্নীত করবে। 

নতুন প্রতিষ্ঠিত শিল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য করদাতাদের কর রেয়াতের মতো সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে প্রলুব্ধ করা। নতুন আইনে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), করের জন্য অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের প্রতিদান এবং উইথহোল্ডার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ডব্লিউআইএন) এর নিবন্ধনমুক্তকরণের জন্য নতুন নিয়ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের লক্ষ্য একটি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দেশের আয়কর কাঠামোকে আধুনিকীকরণ করা। 

নতুন আয়কর আইনের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- উন্নত কর ব্যবস্থাপনা, বিরোধী পদক্ষেপ এড়ানো, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সরলীকৃত কর কাঠামো। হালনাগাদ করের হার এবং স্ল্যাব সহ, আইনটি ব্যক্তি এবং কর্পোরেশন উভয়ের স্বার্থ পূরণে সরল কর ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করে। ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে কর প্রশাসনের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। এই আইন ডিজিটাল বিচারিক প্রক্রিয়াসহ দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ এবং ট্যাক্স রিটার্ন সহজে জমা দেওয়ার সুবিধা দেয়। কর ফাঁকি নিরুৎসাহিত করতে এবং সমস্ত করদাতাদের জন্য ন্যায্যতা প্রদানের জন্য এই আইনে দৃঢ় বিধান রয়েছে। 

আয়কর রিটার্ন দাখিল সহজীকরণ ও আয়কর রিটার্ন দাখিলে উদ্বুদ্ধকরণে “আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতকারী বিধিমালা, ২০২৩” প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে এতে।

আয়কর আইন কার্যকরের জন্য সরকারের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ উভয়ই প্রয়োজনীয়। জনসাধারণের ভূমিকা শুরু হয় করের বিধি ও প্রবিধানের যেকোনো পরিবর্তনের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখার মাধ্যমে। এতে জনগণ স্বেচ্ছায় করদানে আগ্রহী হন এবং সম্ভাব্য ছাড়, ক্রেডিট এবং প্রণোদনার হার বেড়ে যেতে পারে। 

কর্তৃপক্ষ যাতে করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি সত্যিকারের চিত্র পায় সেজন্য ব্যক্তি এবং ব্যবসায়ীদের উচিত আয়, কর্তন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য সঠিকভাবে তুলে ধরা। সেজন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ট্যাক্স রিটার্নও জমা দিতে হবে। অডিট বা তদন্তের সময়, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সরবরাহ করে এবং স্বচ্ছ উপায়ে যেকোনো সমস্যা সমাধান করে কর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী উভয়কেই কর পরিহারে বেআইনি কর্মকাণ্ড যেমন সম্পদ লুকানো, উদ্দেশ্যমূলকভাবে আয়ের কম প্রতিবেদন দেওয়া বা অন্যান্য প্রতারণামূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগ বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে “প্রত্যক্ষ করব্যয়” প্রাক্কলন করেছে, যা আয়কর বিভাগের সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রচেষ্টার ফসল।  এ অর্থবর্ষে প্রাক্কলিত ‘‘প্রত্যক্ষ করব্যয়’’-এর মোট পরিমাণ হবে ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৪১ কোটি টাকা।  এর সাথে প্রাক্কলিত ভর্তুকির পরিমাণ যোগ করলে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

নতুন আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৬৬ ধারা অনুসারে দেশের প্রত্যেক নাগরিককেই আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে ট্যাক্স প্রবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত করতে হিসাবরক্ষক বা কর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। 

কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় ট্যাক্সের বাধ্যবাধকতা কমানো যায় বিশেষজ্ঞরা সে সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন। নতুন আয়কর নীতি ২০২৩-এর ১৬৭ ধারা অনুসারে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সঙ্গে পরিসম্পদ ও দায় বিবরণী জমা দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। 

যদিও এতে স্পষ্ট বলা আছে, আয়বর্ষের শেষ তারিখে ৪০ লাখ টাকার অধিক সম্পত্তির মালিক হলেই সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর ঘাটতি রয়ে গেছে তা হলো প্রথমবার যারা রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের সম্পদ বিবরণীতে প্রমাণপত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নতুন আয়কর আইনে রিটার্ন দাখিলের জন্য সময় বৃদ্ধির কোনো বিধান রাখা হয়নি। তাই কেউ যদি জাতীয় আয়কর দিবসের (৩০ নভেম্বর) মধ্যে আয়কর রিটার্ন ফাইল করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি কোনো ধরনের কর অব্যাহতি সুবিধা নিতে পারবেন না। এক্ষেত্রে এনবিআর বড় অঙ্কের টাকা জরিমানা করতে পারে এবং উপরন্তু ২৪ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে কর দায়ের ওপর অতিরিক্ত ৪% সুদ দিতে হবে। 

তাই বিশেষজ্ঞদের এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং নতুন বিধানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। পেশাদারদের উন্নত ভোক্তা উপদেশ, কৌশল অভিযোজন, এবং নতুন ট্যাক্স কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। 

আয়কর আইন কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য জনগণ ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। যখন সাধারণ জনগণ এবং কোম্পানিগুলো তাদের বাধ্যবাধকতাগুলো পালন করে, তখন একটি ন্যায্য এবং কার্যকর কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। যা অবকাঠামো এবং সরকারি পরিষেবাগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করে।

নতুন আয়কর আইন ২০২৩-এর প্রারম্ভিক প্রবর্তন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে বড় অবদান রেখেছে। এটি করদাতাদের সুবিধা বাড়ায়, নতুন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার উন্নতিতে সহায়তা করবে এবং সরকারি আয়কর ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করে। 

এ আইনের অনেক বৈশিষ্ট্য আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রভাব ফেলবে, যেমন করদাতাদের আইডেন্টিটি নম্বর, ডিজিটাল রূপান্তর, এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার।

মোছা. ফাতেমা তুজ জোহরা জিদনী, শিক্ষার্থী
অ্যাকাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্‌ বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links