Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শুধু বিচারেই কি থামবে ধর্ষণ?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৬:০১ পিএম

রাজধানীর পল্লবীতে শিশুহত্যার ঘটনায় ফুঁসছে গোটা দেশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে শিশুটিকে। যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরাধীর বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছে মানুষ। তবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে মানুষের এই জোটবদ্ধ প্রতিবাদ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় ধর্ষণের ঘটনায় মানুষ এমন সোচ্চার হয়েছেন। এই যে ধর্ষণ ইস্যুতে অপরাধীর বিচারের দাবিতে একাট্টা হয়ে মানুষের প্রতিবাদ, এটা আশা জোগায়; সাহস জোগায়। কিন্তু সেইসঙ্গে এমন প্রশ্নও ওঠা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, শুধু প্রতিবাদ আর বিচার নিশ্চিত হলেই কি থামবে ধর্ষণ? যদি তাই হতো তাহলে গতবছর মাগুরায় শিশুধর্ষণ ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ আর অপরাধীদের দ্রুত বিচারের পর থেমে যেত এমন ঘটনা। কিন্ত বাস্তব পরিস্থিতি যে পুরোটাই বিপরীত তা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়।  

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টা, ধর্ষণের পর হত্যা, এমনকি নির্যাতনের পর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার বড় অংশেই অভিযুক্তরা প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিচিত মানুষ কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠজন। 

শুধু চলমান মে মাসের সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় নিখোঁজের একদিন পর চার বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুরসালিন শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ১৯ মে পাবনার চাটমোহরে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। আর পল্লবীর ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদের মধ্যেই চট্টগ্রামে অন্তত দুজন শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ সামনে এসেছে। সবশেষ গত ২২ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর একটি মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের ধর্ষণের অভিযোগও পাওয়া গেছে এই আলোচনার মধ্যেই। এর আগে গত মার্চে, মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসনালী কেটে দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুটি মারা যায়। 

ধর্ষণের ঘটনার এমন ফিরিস্তি বলে শেষ করা যাবে না। বছরের পর বছর ধরে গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধা, শিশুকন্যা, কিশোরী, তরুণী, গৃহবধূ, পেশাজীবী নারী, প্রতিবন্ধী ও মানসিক বিকারগ্রস্ত নারী কিংবা ছেলেশিশু; কোথাও কেউ নিরাপদ নয়। 

প্রতিবারই ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ হয়। কিছুদিন যেতেই নতুন আরেক ঘটনা ঘটে, চাপা পড়ে যায় আগের ঘটনা। তাহলে, ধর্ষণ থামবে কীভাবে? আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন। তবে, এটুকু অন্তত চোখবুজে বলেই দেওয়া যায় যে শুধু প্রতিবাদ আর বিচার নিশ্চিত হলেই ধর্ষণ থামবে না। বদলাতে হবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। 

গবেষক ও সমাজবিশ্লেষকদের মতে, ধর্ষণের মতো অপরাধ হঠাৎ করে তৈরি হয় না; এর পেছনে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা সামাজিক বিকারও ভূমিকা রাখে। সমাজে মাদকপ্রবণতা বেড়ে যাওয়া, সহিংসতা ও বিকৃত যৌনতাকে স্বাভাবিক করে তোলা ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তার, পরিবারে মূল্যবোধচর্চার সংকট, শিক্ষাঙ্গনে মানবিক বোধ তৈরির দুর্বলতা এবং ক্ষমতার জোরে অপরাধীদের বারবার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। সব মিলিয়ে এক ধরনের বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে সহিংস মানসিকতা আরও সহজে বেড়ে ওঠে। 

শিশুধর্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, সমাজের একটি অংশ এখনও শিশুবিবাহকে নানাভাবে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এতে পরোক্ষভাবে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়, যেখানে শিশুকেও যৌন সম্পর্ক বা দাম্পত্যের উপযোগী হিসেবে ভাবতে শেখে কিছু মানুষ। ফলে শিশুদের প্রতি সহিংস ও বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির সামাজিক বাধাগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

এছাড়া, আমরা প্রায়ই ধর্ষণকে শুধু “যৌন অপরাধ” হিসেবে দেখি। তবে গবেষণা বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতার প্রদর্শন। এখানে যৌনতা যতটা আছে, তার চেয়েও বেশি আছে নিয়ন্ত্রণ, অপমান আর আধিপত্যের মানসিকতা। একজন ধর্ষক অনেক সময় বিশ্বাস করে; সে পার পেয়ে যাবে। এই বিশ্বাসই তাকে ভয়হীন করে তোলে।

ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস গ্রথের গবেষণা প্রায়ই সামনে আসে। তিনি অ্যান বারগেস ও লিন্ডা হোলমস্ট্রমের সঙ্গে মিলে বহু ধর্ষক ও ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধর্ষণের পেছনে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা কাজ করে না; বরং রাগ, হতাশা, ক্ষোভ, হীনমন্যতা, বিকৃত ক্ষমতাবোধ এবং নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাও গভীরভাবে কাজ করে।

নিকোলাস গ্রথ ধর্ষণকে মূলত দুটি বড় মানসিক অক্ষে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন-ক্ষমতা এবং ক্ষোভ।

ক্ষমতার জন্য সংঘটিত ধর্ষণে অপরাধী ভয়ভীতি, নিয়ন্ত্রণ কিংবা আধিপত্যের মাধ্যমে নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে ঢাকার চেষ্টা করে। অনেক ধর্ষক ধর্ষণের পর এক ধরনের বিকৃত আত্মতৃপ্তি অনুভব করে; যেন সে নিজের পুরুষত্ব বা কর্তৃত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে। কেউ নিজের যৌনক্ষমতা নিয়ে ভেতরে অনিরাপদ বোধ করে, কেউ আবার পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করার বিকৃত আনন্দ পায়।
অপরদিকে, ক্ষোভভিত্তিক ধর্ষণে যৌনতা অনেক সময় মুখ্য থাকে না; বরং অপমান, প্রতিশোধ বা সহিংস আনন্দের বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে। কিছু মানুষ নিজের ভেতরের রাগ, ব্যর্থতা বা হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় দুর্বল কারও ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে। সেখানে ধর্ষণ হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রতিশোধের ভাষা।

এই জায়গাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, তখন ধর্ষণ আর কেবল শরীরের বিরুদ্ধে অপরাধ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বিকৃত মানসিক ক্ষমতার চর্চা।

ধর্ষকদের মনস্তত্ত্ব বিষয়ক কিছু গবেষক সুযোগসন্ধানী ধর্ষকের কথা বলেছেন; যারা তখনই অপরাধ করে যখন মনে করে ধরা পড়ার ঝুঁকি কম। আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অনেক সময় ব্যক্তি একা যে সহিংসতা করতে সাহস পেত না, দলগত উন্মাদনায় সেটাই করে ফেলে। অর্থাৎ সামাজিক পরিবেশও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

এছাড়া, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর এখনও গভীর বৈষম্য রয়ে গেছে। মেয়েদের পোশাক, চলাফেরা, রাতের বাইরে থাকা—সবকিছুর বিচার হয়। কিন্তু খুব কম পরিবারেই ছেলেদের শেখানো হয়, “না মানে না।” খুব কম জায়গায় সম্মতি বা সম্মতির সীমা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। ফলে এক ধরনের বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরি হয়, যেখানে নারীকে মানুষ নয়, বরং তাদের “ভোগের অধিকার” পুরুষের রয়েছে এমনটা ভাবার প্রবণতা জন্ম নেয়।

আর শিশু ধর্ষণকে শুধু “যৌন আকাঙ্ক্ষা” দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু ধর্ষণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে থাকে বিকৃত যৌন আকর্ষণ বা শিশুদের প্রতি অস্বাভাবিক যৌন আগ্রহ। কিছু ক্ষেত্রে কাজ করে সহজ লক্ষ্য বেছে নেওয়ার মানসিকতা। শিশু দুর্বল, সহজে ভয় পায়, প্রতিরোধ করতে পারে না, অনেক সময় ঘটনাটি ভাষায় প্রকাশও করতে পারে না। অর্থাৎ অপরাধীর কাছে শিশু হয়ে ওঠে সবচেয়ে অসহায় শিকার।

আবার অনেক শিশুধর্ষণের ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়; বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিচিত মানুষ। এখানে অপরাধের সুযোগ, বিশ্বাসের অপব্যবহার এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখে। এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়; ধর্ষণ অনেকক্ষেত্রেই হিসাব করা, সুযোগসন্ধানী এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপরাধ।

যে মানুষ জানে একটি শিশু তাকে বিশ্বাস করে, প্রতিবাদ করতে পারবে না, সমাজ হয়তো শিশুকেই চুপ করিয়ে দেবে; সে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। ফলে শিশু ধর্ষণ শুধু আইনি অপরাধ নয়, এটি বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং মানবিকতার বিরুদ্ধে গভীর আঘাতও।

সবমিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে দীর্ঘ ও ধীর বিচারপ্রক্রিয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী পরিবারকে বছরের পর বছর আদালত, থানা ও তদন্তের পেছনে ঘুরতে হয়, তবু বিচার আদৌ শেষ হবে কিনা—সেই অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। এতে নির্যাতিত পরিবার মানসিক ও সামাজিকভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, আর অপরাধীদের মাঝেও একটি ধারণা জন্মায় যে শেষ পর্যন্ত হয়তো পার পাওয়া সম্ভব।

কঠোর শাস্তি অবশ্যই দরকার। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারও জরুরি। বিচারহীনতা অপরাধীকে সাহস দেয়। যখন মানুষ দেখে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা প্রভাবের কারণে কেউ বেঁচে যাচ্ছে, তখন আইনের ভয় কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার শক্ত অবস্থান অপরিহার্য। তবে, বিশ্বের অনেক দেশে কঠোর শাস্তি থাকার পরও ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। কারণ, অপরাধী শুধু শাস্তির ভয় দেখে না; সে দেখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটা। যদি তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষী নিরাপদ না থাকে, ভুক্তভোগীকেই উল্টো অপমান সহ্য করতে হয়-তাহলে কঠোর আইনও অনেক সময় কাগজে আটকে থাকে।

তাই, ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না, চর্চাটা শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। মেয়েদের চলাফেরার নিয়মকানুন শেখানোর চেয়ে ছেলেদের শেখাতে হবে নারীর প্রতি সম্মান। একইভাবে বদলাতে হবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও। বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মীদের আড্ডায় বদলাতে হবে নারীদের নিয়ে মুখরোচক আলাপচারিতার সংস্কৃতি। দায়িত্ববান হতে হবে ধর্মীয় নেতাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্পর্ক, সম্মতি ও যৌনতা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দরকার। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের ভেতরের অপরাধীদের আড়াল করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।সবচেয়ে বড় কথা, ধর্ষণকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি পুরো সমাজের সংকট। যে সমাজে একজন নারী নিরাপদ না, সেই সমাজ আসলে কারও জন্যই নিরাপদ না। 

 

                                                           

 মারুফ খলিফা, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী            

   প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়

   

About

Popular Links

x