Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডেঙ্গু পরিস্থিতি: বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত?

  • মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০
  • ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২,৯০৫ জন
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৩, ০৩:৫৮ পিএম

দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে অবশ্যই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ।

রবিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান তার পরামর্শ তুলে ধরেন।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। এডিস মশাবাহিত রোগটির প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে মশা দমনের ওষুধ ব্যবহার এবং ফুলহাতা কাপড় পরিধানের মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।

রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ২০২৩ সালে রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৯৮ জনে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৫,৪১১ জন। অন্যদিকে, সুস্থ হয়েছেন ৭৫,২৮০ জন। যেকোনো বছরের তুলনায় সংখ্যাটি এ সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাধারণত আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গুর প্রকোপের পিক টাইম ধরা হয়।

২০১৬ সালে অবসর নেওয়ার আগে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আইইডিসিআর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সংক্রামক রোগের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটিতেও ছিলেন। ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের জন্য কালবিলম্ব না করে “ওলবাচিয়া” পদ্ধতিটি অনুসরণ করা উচিত।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “এর আগে দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ছিল ২০১৯ সালে। ওই বছর ওলবাচিয়া পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তা চালু হয়নি। আমরা যদি ২০১৯ সালে এটি শুরু করতে পারতাম, আহলে এ বছর আমরা কিছু সুবিধার আশা করতে পারতাম।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ষাটের দশকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সর্বপ্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তখন “ঢাকা জ্বর” নামে পরিচিত ছিল। ২০১০ সালে এসে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, অত্যধিক বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, বন্যা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ঋতুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো অন্যান্য মশাবাহিত রোগের সংক্রমণের জন্য বাংলাদেশের জলবায়ু পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়ে উঠেছে।

অন্যান্য রোগের মতো ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। সময়মতো রোগ শনাক্ত, গুরুতর ডেঙ্গু সংক্রমণের লক্ষণ যেমন গুরুতর পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া এবং জ্বর কমার পর মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া এসব লক্ষণ শনাক্ত এবং চিকিৎসাই হলো এ রোগে মৃত্যুর হার কমিয়ে ১% এর চেয়ে নিচে নামিয়ে আনার মূল উপায়।

ডেঙ্গু ব্যানার

দ্রুত পদক্ষেপ

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “সারা বছর ধরে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগের পরিকল্পনাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি। এর জন্য ক্ষুদ্র পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের চিহ্নিত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে নিয়ে একটি ওয়েবভিত্তিক ডেঙ্গু নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আক্রান্তের তথ্যের পুনরাবৃত্তি এড়াতে টেলিফোন নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের সব এলাকার হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে চিহ্নিত করা উচিত।”

সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অঞ্চলভিত্তিক মশা নজরদারি কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোরও তাগিদ দেন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান।

তিনি বলেন, “রোগীদের ভালো ব্যবস্থাপনার জন্য ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এটি পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সব উপসর্গ থাকলেও ডায়াগনস্টিক ল্যাবে অনেকের নমুনা পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েনি। তাই বাজারে যেসব ডায়াগনস্টিক কিট পাওয়া যায়, সেগুলোর মানের ওপরও জোরালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।”

আইইডিসিআরের সাবেক এ পরিচালক আরও বলেন, একইসঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের উচিত নিজেদের কীটনাশক স্প্রের নীতি পর্যালোচনা করা। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা দরকার। গবেষণার মাধ্যমে সারা বছর এসব কার্যক্রমের নিরীক্ষণ অবাহত রাখা উচিত।

ওলবাচিয়া

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের জন্য “ওলবাচিয়া” পদ্ধতিটি অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানান, ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রাম, অস্ট্রেলিয়ার মতে, ওলবাচিয়া একটি মশার মধ্যে দুটি উপায়ে কাজ করে। প্রথম উপায় হলো মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া, মায়ারো বা হলুদ জ্বরের সংক্রমণ রোধের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। মশা যদি সংক্রামিত হতে না পারে, তাহলে এ ভাইরাসগুলো মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।

ওলবাচিয়া হলো এক ধরনের নিরাপদ প্রাকৃতিক ব্যাক্টেরিয়া যা কয়েক ধরনের মশাসহ প্রাণীকূলের ৫০% প্রজাতিতে বিদ্যমান। তবে এডিস এইজিপ্টি প্রজাতির মশায় এটি দেখা যায় না। আর এই ধরনের মশাই ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং হলুদ জ্বরের মতো মহামারির বিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখে।

ওলবাচিয়ার কার্যকারিতার দ্বিতীয় উপায়টি কোলেস্টেরলের মতো অণুকণার জন্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা। মশার মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য ভাইরাস এবং ওলবাচিয়া উভয়েরই কোলেস্টেরল প্রয়োজন। যখন ওলবাচিয়া উপস্থিত থাকে, তখন সেটি এই অণুগুলোকে গ্রাস করে এবং ভাইরাসের জন্য প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি করে। ভাইরাস ঠিকমতো বাড়তে না পারলে তাদের পক্ষে সংক্রমণ ছড়ানো দুরূহ হয়ে পড়ে।

ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রাম জানায়, “আমরা ল্যাবে ওলবাচিয়াবাহী মশার ঝাঁক লালন-পালন করি। ল্যাব থেকে অল্প কিছু মশা নিয়ে আমরা কাঙ্ক্ষিত এলাকায় ছেড়ে দেই। সেখানে তারা বংশবিস্তার করে এবং প্রকৃতিতে থাকা মশার মধ্যে ওলবাচিয়া ছড়িয়ে দেয়। এভাবে ওলবাচিয়া বাড়ে এবং প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা ৯০%-এরও বেশি মশার মধ্যে বিস্তার ঘটায়।”

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এটি (ওলবাচিয়া) বিশ্বব্যাপী নেওয়া একটি কার্যকর সমাধান। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত না করেই এই পদ্ধতিটি মশাবাহিত রোগ থেকে মানব সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে পারে।”

   

About

Popular Links

x