রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে সরকার। কয়েকটি কমিশন ইতোমধ্যে তাদের কাজ এগিয়ে এনেছে বলে জানা গেছে। এরমধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দেবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) সচিবালয় বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান। এ সময় তার সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্যসচিব মো. মোখলেস উর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
এদিন তারা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত বেশকিছু সুপারিশ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। যেগুলো নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
কমিশন যেসব সুপারিশ করবে বলে জানিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিল; সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিদ্যমান ২৬টি ক্যাডার থেকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডার বাদ দেওয়া; উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদে পরীক্ষা দিয়ে পদোন্নতি; উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০% এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০% করা।
তবে এসব প্রস্তাবিত সুপারিশের কয়েকটি নিয়ে প্রশসানের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। আর সেই অসন্তোষ এতোটাই প্রকট যে আমলাদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে এসব বিষয় নিয়ে বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে। এমনকি কমিশন সরকারের কাছে প্রতিবদেন জমা দেওয়ার আগেই সেটি জনসম্মুখে প্রকাশ করার কারণেও ক্ষুব্ধ হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
এখন পর্যন্ত ৬৪ জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন, বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের মতো বড় সংগঠন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
৬৪ জেলা প্রশাসকের প্রতিবাদ
উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য ৫০% ও অন্য ক্যাডারের জন্য ৫০% করা বিষয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের সব জেলার জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)।
১৮ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দপ্তরে এ সংক্রান্ত যৌথ প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছেন তারা।
এতে বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়ার আগেই আকস্মিকভাবে এই ধরনের ঘোষণা অনভিপ্রেত, আপত্তিকর ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দুর্বল করার শামিল।
উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংস্কার কমিশন যে ধরনের সুপারিশ করার চিন্তা করছে, তা বাস্তবতা বিবর্জিত। এ ধরনের উদ্যোগ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, রাষ্ট্রে প্রশাসন ক্যাডারের কার্যপরিধির সঙ্গে নীতি নির্ধারণের নিবিড় সম্পর্ক। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্য ক্যাডারের বড় পার্থক্য হলো- প্রশাসন ক্যাডারের কাজের ধরণ সামগ্রিক বিষয়কে ধারণ করে। যেখানে অন্যান্য ক্যাডারের কাজের ধরন বিশেষায়িত।
এতে আরও বলা হয়, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা মাঠ প্রশাসনে সামগ্রিক কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী জায়গা সচিবালয়ে আসেন। ফলে তারা মাঠের বাস্তবতা, অর্জিত জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক তথা রাজনীতিকদের সহায়তা করতে পারেন। যা রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে যোগসূত্র তৈরি করে। এ কারণে মাঠ প্রশাসনে কর্মকর্তাই এই কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।
উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ৭৫% এবং অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ২৫% পদোন্নতি পেয়ে থাকেন।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবাদ
উপসচিব পদে পদোন্নতির শতকরা হারের বিষয়ে কমিশনের সুপারিশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। উপসচিব/যুগ্মসচিব/অতিরিক্ত সচিব/সচিব পদে শতভাগ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন হওয়া উচিত বলেও মনে করে সংগঠনটি।
১৮ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আপত্তির কথা জানায় সংগঠনটি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন থেকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় কমিশন প্রধানের দেওয়া বক্তব্যের প্রতি বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। কমিশন প্রধান সরকারের উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য বিদ্যমান ৭৫% থেকে কমিয়ে ৫০% করার সুপারিশের বিষয় অবহিত করেছেন। একটি জনমুখী, দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং যুগোপযোগী জনপ্রশাসন বিনির্মাণে প্রজাতন্ত্রের সর্বনিম্নতম বেতন গ্রেডের কর্মচারি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বেতন গ্রেডের কর্মকর্তা পর্যন্ত বিবেচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়ন করাই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া আবশ্যক বলে অ্যাসোসিয়েশন মনে করে।
এতে বলা হয়, উপসচিব পদোন্নতি প্রত্যাশী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতামত, জরিপ, সমীক্ষা সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়নি বলে জানা যায়। ফলে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে মাঠ প্রশাসনসহ সকল স্তরে কর্মরত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন কমিশন প্রধানের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সার্ভিসের কর্মকর্তারা যখন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনামতে আইন-শৃংখলাসহ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে এ ধরনের একটি বক্তব্য আন্ত:সার্ভিস দ্বন্দ্বকে উসকে দিতে পারে এবং সংস্কার উদ্যোগসহ জনপ্রশাসনকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে অ্যাসোসিয়েশন আশঙ্কা ব্যক্ত করছে। কমিশনের লিখিত রিপোর্ট সরকারের কাছে দাখিলের আগেই আকস্মিকভাবে এ ধরনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেন প্রকাশ্যে নিয়ে আসা হলো এবং তা কোনো মহলের ইন্ধনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমকে অস্থিতিশীল করার অপপ্রয়াস কি-না তা খতিয়ে দেখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, উপমহাদেশে সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে সব সময়েই প্রশাসন ক্যাডার/সার্ভিসের লোকেরাই উপ-সচিব/যুগ্মসচিব/অতিরিক্ত সচিব/সচিব পদে কাজ করে আসছেন। কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মহল মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন যে, এই পদগুলো প্রশাসন ক্যাডার প্রিভিলিজ হিসেবে পান যেটি রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রতিফলন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে সব সময়ে সব স্থানে রাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বর্তমান প্রশাসন ক্যাডারের অনুরূপ একদল মানুষ নিয়োজিত ছিলো। রাষ্ট্র যাতে জনতার স্বার্থ সংরক্ষণ করে সেই উদ্দেশ্য ম্যাক্স ওয়েবার ও উড্রো উইলসন মেধাভিত্তিক, রাজনীতিবিদ থেকে আলাদা, আইন-কানুনকে কঠোরভাবে অনুসরণ করা একদল মানুষের সমন্বয়ে আমলাতন্ত্রের ধারণার প্রচলন করেন। উপমহাদেশে আইসিএস, পাকিস্তান আমলে সিএসপি ও বাংলাদেশের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার মেধাভিত্তিক সেই আমলাতন্ত্রের মূল ধারা। এ ধারার ব্যত্যয় ঘটানোর অপচেষ্টা না করে দক্ষ আমলাতন্ত্র তৈরিতে সংস্কারের সুপারিশ বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সাদরে সমর্থন করে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রের কল্যাণের স্বার্থে মনে করি, চারটি কারণে উপসচিব/যুগ্মসচিব/অতিরিক্ত সচিব/সচিব পদে শতভাগ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন হওয়া উচিত।
এতে বলা হয়, আমরা জুলাই-বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম একটি যুগোপযোগী, নিরপেক্ষ এবং প্রফেশনাল সিভিল প্রশাসন বিনির্মাণে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারকে পৃথক করে পূর্বের ন্যায় সকল পদগুলো অন্তর্ভুক্ত করে “বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস” প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। একইসঙ্গে, প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য ক্যাডার/নন-ক্যাডার সকল সার্ভিসকে স্ব- স্ব কাজের ধরন বিবেচনা করে স্বীয় সার্ভিসে পদোন্নতির সুযোগ বৃদ্ধিসহ যথাযথ ক্যারিয়ার প্লানিং এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ/বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অধিকতর বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে যুগোপযোগী কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
এতে আরও বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে জুলাই-বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম জনপ্রশাসন বিনির্মাণে নিছক কিছু বিধি-বিধানের পরিবর্তন বা সংশোধন যথেষ্ট নয় বরং এমন একটি জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন বিনির্মাণ করতে হবে, যা জনগণের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা, জনকল্যাণ, সুশাসন এবং নাগরিক সেবা প্রদান নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলেছে, জনপ্রশাসন সংস্কার বর্তমান সরকারের বিবেচনাধীন কার্যক্রমগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে জনগণের মধ্যে বিপুল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তাই তড়িঘড়ি করে প্রতিবেদন দাখিলের পরিবর্তে পর্যাপ্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে জনমুখী, সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কমিশনের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হলো।
ক্ষুব্ধ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা
বিসিএস সাধারণ শিক্ষাকে ক্যাডার বহির্ভূত করার খসড়া সুপারিশ প্রত্যাখান করে প্রতিবাদলিপি দিয়েছেন বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার ও বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারকে কাঠামোর বাইরে রাখার সুপারিশ করতে যাচ্ছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৬ হাজার সদস্যের একক মুখপাত্র বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন এই সুপারিশ সর্বোতভাবে সর্বতভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। ২০১২ সালে অনুরূপ একটি প্রচেষ্টা আমরা প্রতিহত করেছি। বিষয়টি মীমাংসিত।
এতে আরও বলা হয়, সংস্কারের মাধ্যমে সব বৈষম্য নিরসন ও গতিশীল জনবান্ধব জনপ্রশাসন তৈরির লক্ষ্যে গঠিত কমিশনের এ ধরনের সুপারিশ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈষম্যবিরোধী মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এ সুপারিশ প্রত্যাহার করা না হলে কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার ব্যর্থ হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা না করে কমিশনের এমন প্রস্তাবনা তৈরি এবং গণমাধ্যমে একতরফাভাবে প্রচার করা সুবিবেচনা প্রসূত নয়।
সংগঠনটি আরও বলেছে, শিক্ষাখাতে অস্থিরতা তৈরি করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার এটি কোনো ষড়যন্ত্র কি-না তা খতিয়ে দেখা উচিত। এরূপ সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষা প্রশাসন এবং সংস্কার কার্যক্রমে স্থবিরতা এলে বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন কোনোরূপ দায় নেবে না। ক্যাডার সংকোচন এবং শিক্ষাকে মেধাশূন্য করার এ অপচেষ্টার আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ক্ষোভ স্বাস্থ্য ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও
বিশেষায়িত বিভাগ বিবেচনা করে স্বাস্থ্যকে ক্যাডার থেকে বাদ দিতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ করতে যাচ্ছে, সেটির প্রতিবাদ জানিয়েছে বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।
অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মো. নেয়ামত হোসেন এবং সদস্য সচিব উম্মে তানিয়া নাসরিন স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদলিপিতে এসব কথা বলা হয়।
বাংলাদেশ হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, ক্যাডার কাঠামোর বাইরে রাখার যে সুপারিশ সংস্কার কমিশন করতে যাচ্ছে, সেই সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করায় স্বাস্থ্য খাত বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগপোযোগী হয়নি। উল্টো পথে হেঁটে আমলাতান্ত্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কায়েম হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্বাস্থ্য ক্যাডারের দক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়ন করে প্রকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব।
এতে বলা হয়, সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্য নিরসন, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন তৈরির লক্ষ্যে গঠিত সংস্কার কমিশন প্রকৃত সংস্কার প্রস্তাব বাদ দিয়ে স্বাস্থ্যকে ক্যাডার-বহির্ভূত করার হঠকারী সুপারিশ করা হচ্ছে। এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন তৈরি ও বৈষম্যবিরোধী মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই সুপারিশ প্রত্যাহার করা না হলে প্রশাসনিক সংস্কার ব্যর্থ হবে।
এতে আরও বলা হয়, সংস্কার কমিশন কর্তৃক বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা ব্যতীত এমন প্রস্তাবনা তৈরি এবং গণমাধ্যমে এক তরফাভাবে প্রচার করা সুবিবেচনা প্রসূত নয়। এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দক্ষতার সুস্পষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও জনগণের প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। উদ্ভুত যেকোনও নেতিবাচক পরিস্থিতির দায়ভার বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন বহন করবে না। আমরা সংস্কার কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানাই, তবে দূরভিসন্ধিমূলক সুপারিশকে সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে মানা হবে না।
হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশের প্রত্যন্ত ইউনিয়ন থেকে রাজধানী পর্যন্ত বাংলাদেশের বৃহত্তম চিকিৎসা প্রদানকারী ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপালনকারী গ্রুপ বিসিএস হেলথ ক্যাডারের অফিসাররা। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানাতে চাই, হেলথ ক্যাডারের সাথে আলোচনা ছাড়া কোনো সংস্কার প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, গত ৪ অক্টোবর আট সদস্যের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পরে আরও তিনজনকে যুক্ত করা হলে কমিশনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ জনে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীকে এ কমিশনের প্রধান করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সাবেক সচিব মোহাম্মদ তারেক ও মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমান; সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া; সাবেক যুগ্ম সচিব রিজওয়ান খায়ের; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ কা ফিরোজ আহমদ; অধ্যাপক সৈয়দা শাহিনা সোবহান, বিসিএস (স্বাস্থ্য), (অবসরপ্রাপ্ত); ফিরোজ আহমেদ, বিসিএস (অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস), (অবসরপ্রাপ্ত); খোন্দকার মোহাম্মদ আমিনুর রহমান, বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি), (অবসরপ্রাপ্ত) ও একজন ছাত্র প্রতিনিধি।
জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থা করে তুলতে এ কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়। কমিশন ৯০ দিনের (৩ মাস) মধ্যে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।



বিসিএস ‘ক্যাডার’ থেকে বাদ পড়তে পারেন শিক্ষক ও চিকিৎসকরা