নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবারও বসেছে পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী “সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা”। পহেলা বৈশাখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিন দিনব্যাপী এ মেলার দ্বিতীয় দিনেই মূল আয়োজন জমে ওঠে, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।
সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বটগাছকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এ আয়োজন। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনমেলা।
ভোর থেকেই বটতলার আশপাশে ভক্তদের ঢল নামে। নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সবাই ফল, মিষ্টান্ন ও পূজার সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বটগাছের নিচে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। রঙিন শাড়ি, ফুলের সাজ আর ধর্মীয় আবহে পুরো এলাকা রূপ নেয় এক বর্ণিল উৎসবে। কুমারী মেয়েরাও উৎসাহভরে অংশ নেয় এ আয়োজনে।
বিশ্বাস করা হয়, এই বটগাছ “সিদ্ধেশ্বরী দেবী” হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রতিবছর নববর্ষে এখানে পূজা দিলে সংসারে সুখ-শান্তি ও স্বামী-সন্তানের মঙ্গল আসে এমন বিশ্বাস থেকেই নারীরা সারা বছর অপেক্ষা করেন এই দিনের জন্য। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে কবুতর ওড়ানো কিংবা পাঁঠা বলি দিয়ে থাকেন।
মেলার আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ ও লৌহশিল্পের তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং বাহারি মিষ্টি ও মণ্ডা-মিঠাইয়ের দোকান মেলাকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের জন্যই রয়েছে আনন্দের উপকরণ।
মেলায় আসা নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এ মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে জেনে আসছেন তারা। প্রতি বছরই এখানে এসে পূজা দেন এবং পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দুপুরে আনুষ্ঠানিক পূজার মাধ্যমে মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং দিনভর ভক্তদের আগমন অব্যাহত থাকে।
আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় বলেন, “নববর্ষ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয় এবং এটি সর্বজনীনভাবে উদযাপিত হয়। এখানে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত জানান, মেলাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।