১২ বছর পরও ঝুলে আছে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিলের সেই দুপুরটি ছিল অন্য দিনের মতোই ব্যস্ত। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে চলছিল স্বাভাবিক যানচলাচল। কিন্তু হঠাৎ সাদা পোশাকে একটি দল তল্লাশির নামে থামায় একটি প্রাইভেট কার। গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাদের তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান সেই দলটি। প্রায় একই সময়ে একই সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয় আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালককে।

তিন দিন পর (৩০ এপ্রিল) শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে একে একে সাতটি মরদেহ। একটি শহরের পরিচিত সাতটি মুখ নিখোঁজ হওয়ার আতঙ্ক তখন রূপ নেয় এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে। দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া, প্রশ্ন ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে।

এই ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আর এই দীর্ঘ অপেক্ষার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

সাতজন নিহতের মধ্যে ছিলেন গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম। তার মৃত্যুর এক মাস পর জন্ম নেয় মেয়ে রোজা আক্তার জান্নাত। এখন ১২ বছর বয়সী রোজা কখনো তার বাবাকে দেখেনি। তার কাছে বাবা মানে শুধু একটি ছবি আর মায়ের চোখে জমে থাকা অশ্রু।

রোজার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর এখনও সেই শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন। মাদরাসায় অন্য শিশুদের বাবার হাত ধরে আসতে দেখলে রোজা চুপ হয়ে যায়, বাসায় ফিরে প্রশ্ন করে “আমার বাবা কোথায়?” এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তার কাছে।

চুক্তিভিত্তিক চাকরির সামান্য আয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়ে মেয়েকে বড় করছেন নুপুর। তবুও তিনি স্বামীর হত্যার বিচার দেখতে চান।

নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটির জীবনে একই ঘটনা। স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। পরে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এখনও মাঝে মাঝে ভেঙে পড়েন, তবে সন্তানরাই তাকে সাহস জোগায়।

এই মামলায় ২০১৭ সালে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। পরে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া থেমে আছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে।

আইনগত প্রক্রিয়া এগোলেও সময়ের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ পরিবারগুলো। তাদের একটাই প্রশ্ন আর কতদিন?

এই ১২ বছরে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি সঠিক বিচারের অপেক্ষা।