একসাথে ৪ ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালো ওমান পুলিশ

ওমানে প্রাইভেট কারের ভেতরে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার প্রবাসী চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমেছে রয়্যাল ওমান পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ওমান’ জানিয়েছে, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। নিহত চার ভাই হলেন, রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তাদের সবার বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

এদিকে, নিহতদের স্বজন, ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের যৌথ প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে চার ভাইয়ের মরদেহ একই ফ্লাইটে দেশে পৌঁছাবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের নেতৃবৃন্দ জানান, গত বুধবার সন্ধ্যায় চার ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদ্দাহর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। রাত ৮টার পর তাঁদের একজন বাংলাদেশে এক আত্মীয়ের কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে নিজেদের অসুস্থতার কথা জানান। তারা নিজেদের লোকেশন শেয়ার করে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো শারীরিক শক্তিও তাদের অবশিষ্ট নেই; নাকে-মুখে ফেনা চলে আসছে এবং নিশ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হচ্ছে। এমনকি ওমানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা দেশে মায়ের ফোনে কল দিয়ে দোয়াও চেয়েছিলেন।

পরবর্তীতে একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে তাদের অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনার পর বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসরোধের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে রয়্যাল ওমান পুলিশ আবদ্ধ অবস্থায় যানবাহনের ভেতরে না ঘুমাতে সবার প্রতি বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।

ঘটনার তিন দিন পার হলেও চার ভাইয়ের বৃদ্ধ মা খাদিজা বেগমকে এখনো জানানো হয়নি যে তাঁর চার ছেলেই আর বেঁচে নেই। তিনি এখনো জানেন, তাঁর ছেলেরা ওমানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ছেলেদের অসুস্থতার খবর শোনার পর থেকেই তিনি নিজে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ছেলেদের মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারবেন না বিধায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে। আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীরা কেউ যেন অসাবধানতাবশত এই খবর মায়ের কানে তুলতে না পারেন, সেজন্য ঘরের ফটকে তালা দিয়ে রেখেছেন তার দেশে থাকা একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ এনাম (৩২)।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্দরাজপাড়া গ্রামে নিহতদের বাড়িতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি রাঙ্গুনিয়া লালানগর বন্দরাজপাড়া মসজিদে নামাজ আদায় শেষে নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মরদেহ দ্রুত দেশে আনার যাবতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি অসহায় এই পরিবারটির পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের কবরস্থানে চার ভাইয়ের দাফনের জন্য পাশাপাশি চারটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। নিহতদের খালাতো ভাই এমরান হোসেন জানান, অত্যন্ত দরিদ্র এই পরিবারটি প্রবাসী ভাইদের পাঠানো টাকায় কেবলই সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিল। চার ভাইয়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি আজ পুরোপুরি নিস্ব।

চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী জানান, গাড়ি দুর্ঘটনা না হওয়ায় এই ঘটনার ব্যয়ভার ওমান সরকার বহন করবে না। ফলে লাশ দেশে পাঠানোর যাবতীয় প্রক্রিয়া ও খরচ নিহতদের স্বজন এবং চট্টগ্রাম সমিতি ওমান যৌথভাবে বহন করছে। মঙ্গলবার বিকেলে মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর রাঙ্গুনিয়ায় তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চার ভাইকে দাফন করা হবে।