দেশে শিশু ধর্ষণের পাশবিকতা ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অথচ শক্ত আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এসব মামলার বিচারে খালাস পেয়ে যাচ্ছে ৭০% অপরাধী। মূলত তদন্তের দুর্বলতা, প্রমাণের অভাব, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আর অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার কারণেই দেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষকেরা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
শিশু ধর্ষণের এই রেকর্ড আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায় সাম্প্রতিক এক বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যবর্তী সময়ে। এ সময় মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যাসহ মোট ৩০৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৭৫% বেশি। এই ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স ছিল ৬ বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। এ সব ঘটনায় ২৫১টি মামলা হলেও আইনি জটিলতায় ৫৫ জন শিশু ভিকটিম পুরোপুরি বিচারের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
দেশে এই ধরনের সংবেদনশীল অপরাধের মামলায় চূড়ান্ত সাজার হার মাত্র ৩%। এর বিপরীতে তথ্য, প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে প্রায় ৭০% মামলার আসামিরাই শেষ পর্যন্ত আদালত থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা তাদের অত্যন্ত পরিচিত প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারাই এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এর পেছনে কেবল ব্যক্তিগত অপরাধপ্রবণতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং সর্বোপরি 'অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার' সামগ্রিক প্রবণতা দায়ী।