রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম বাজারে আসবে ২০ জুন

দেশের জিআইপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম আগামী ২০ জুন থেকে বাজারে আসা শুরু হবে। দেশে উৎপাদিত একমাত্র আঁশবিহীন সুস্বাদু হাড়িভাঙ্গা আম দেশে উৎপাদিত সকল আমের সেরা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। এবারেও গাছে আম পুষ্ট হবার আগেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে ২৫ কোটি টাকারও বেশি রপ্তানি আদেশ পেয়েছে আমবাগান মালিকরা। তবে এবার বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে আমের ফলন কম হবার আশংকা করছেন আমচাষীরা।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ করা হয়। যা গত বছরের চেয়ে ২শ হেক্টর বেশি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পরেও ৩০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবার আশা করছেন বাগানমালিক ও চাষীরা। এতে করে ২শ কোটি টাকার আম বিক্রি হবার আশা চাষীদের।

এদিকে, কৃষি বিভাগ জানিয়েছে হাড়িভাঙ্গা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে বলে আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমের আকার এবার অন্যান্য বারের চেয়ে ভালো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। 

তবে এবার পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষুদ্র চাষীদের অভিযোগ তারা ন্যায্যমূল্য পান না। যদি আম সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকতো তাহলে তারা আরও বেশি লাভবান হতেন। চাষিদের অভিযোগ, বড় ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে আমের বাগান কিনে নেওয়ায় তারা লাভ করছেন বেশি। তারপরেও হাড়িভাঙ্গা আম বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। এই আম চাষ করে হাজার হাজার পরিবার এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বি।

সরজমিন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সারি সারি আমের বাগান। এ ছাড়াও প্রতিটি বাড়িতে ১০ থেকে ১৫টি হাড়িভাঙ্গা আমের গাছ। আবার কোনো কোনো বাড়িতে তার চেয়েও বেশি। গাছের আম পাকা শুরু হয়ে গেছে বলে আমচাষীরা জানালেন।

ওই এলাকার আমচাষি নোয়ার হোসেন, রহমত আলী, আয়েশা বেগমসহ অনেকেই জানালেন, ১০ বছর আগেও এসব এলাকা ছিল চরম দরিদ্র। মানুষ তিনবেলা তো দূরের কথা একবেলাও খাবার জোটাতে পারতো না। এলাকার মাটি লাল হওয়ায় এখানে বছরে একবার ধান উৎপাদন হয়। বাকি ৮ মাস পতিত পড়ে থাকে জমি। কিন্তু হাড়িভাঙ্গা আম তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন ধানের বদলে ওই জমিতে আমের বাগান গড়ে তুলেছেন তারা। বছরে আম বিক্রি করে তাদের সংসারে এখন সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

যাদের জমি নেই সেইসব ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের বাস্তভিটাতেই হাড়িভাঙ্গা গাছ লাগিয়ে উৎপাদিত আম বিক্রি করে সচ্ছলভাবেই জীবনযাপন করছেন। তবে আমচাষিদের  সকলের একটাই দাবি, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। কারণ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় তারা অনেক কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ব্যাপারে সরকার জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে এমন প্রত্যাশা তাদের।

হাড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় বাগান মালিক রমজান আলী জানান, ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন আড়তদার-ব্যাবসায়ী এবার অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করেছেন। তার মতো আরও অন্তত ৪০টি বাগান মালিকদের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে। আপাতত ২০ কোটি টাকার অর্ডার মিলেছে। এটা এবার ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) রুহুল আমিন জানিয়েছেন, সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম কিনতে পারেে এজন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আমের পাইকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইনশৃংখলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে।

এদিকে আম দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাবার জন্য নামকরা কুরিয়ার সার্ভিসগুলো পদাগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অফিস স্থাপন করেছে। তারা বাগান থেকে আম সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা করেছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সহকারী উপপরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, এবার অবিরাম ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও তেমন বড় ক্ষতি হবে না।

অন্যদিকে, রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিপণন বিভাগের উপপরিচালক সিফাত জাহান জানান, হাড়িভাঙ্গা আম রংপুরের ঐতিহ্যকে বেশি করে দেশে বিদেশে পরিচিত করেছে। এবার ৩০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। কারণ নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠেছে। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবারেও আমচাষিরা লাভবান হবেন।