রাজশাহী বিভাগে বেড়ে চলেছে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সিরাজগঞ্জ জেলায়। সবচেয়ে কম আক্রান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আক্রান্তের তালিকায় বেশিরভাগই পুরুষ।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক সংকোচ এবং গোপন নেটওয়ার্কের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিভাগের ৮ জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৪ জন। এর মধ্যে বগুড়ায় ১০৯ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, পাবনায় ৭৮ জন, রাজশাহীতে ১৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ৩১০ জন আক্রান্ত রয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলায়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৮৫২ জন পরীক্ষা করিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর একজন। বৈবাহিক অবস্থার হিসেবে আক্রান্তদের মধ্যে বিবাহিত ৪৮ জন এবং অবিবাহিত ৬৭ জন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আক্রান্ত রয়েছেন ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন। এছাড়া প্রবাসফেরত আক্রান্তের সংখ্যা ৪ জন।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্তদের মধ্যে সমকামী ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে এসেছেন এমন ব্যক্তি ৩৫ জন, যক্ষ্মা রোগী ২ জন, যৌনকর্মী ১ জন, তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর ২ জন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১৪ জন রয়েছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়, হাসপাতালের তথ্যের বাইরে শনাক্ত হওয়া আরও ৩৪ জন রোগীর তথ্য দিয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই সমকামী। এদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সদস্য। বৈবাহিক অবস্থার বিবেচনায় ২৫ জন বিবাহিত এবং ৬ জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক হিসেবে ২৫ বছরের কম বয়সী ৯ জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আক্রান্ত এক ব্যক্তি বলেন, “অসচেতনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে আমি এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছি। পরে রোগটি এইডস পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অনেকেই এখনো রোগটির ঝুঁকি ও পরিণতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।”
বারিন্দ কলেজ অব নার্সিং সায়েন্সেসের শিক্ষার্থী মাহাফুজা রাহাত বুশরা বলেন, “এইচআইভির বিস্তার শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও। সচেতনতার ঘাটতি, ভুল তথ্য, সামাজিক স্টিগমা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ অনেক মানুষকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।”
এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, “এইচআইভি আক্রান্তদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশ এখনো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। এতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যে যৌন সংক্রমণ, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন উপায়ে একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “সমকামিতা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর নৈতিক অবক্ষয় ও মানবস্বভাববিরোধী আচরণ। এটি শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থি নয়, সামাজিকভাবেও পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।”
গত কয়েক বছরে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “পুরুষ সমকামীদের মধ্যে, বিশেষ করে রিসিভটিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এতে পায়ুপথে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।”
রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, “যৌন আচরণজনিত কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমকামীদের মধ্যে শনাক্তের হার বেশি। একই সঙ্গে যৌনপল্লিতে যাতায়াতকারীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক।”