বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান শহরে সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম ২.৫) দূষণের কারণে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪২ জন মানুষ বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতিবছর আনুমানিক ৮৮,২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে।
একইসঙ্গে বায়ুদূষণের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫%।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘পপুলেশন (Population)’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গবেষণার বিভিন্ন তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে, বুধবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে গবেষণা দল।
পিএম ২.৫ দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনক
গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি প্রধান শহরে পিএম ২.৫ দূষণের মানবস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৬০ জনের মৃত্যু বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে বছরে হৃদরোগে ৩৭,৫১৯ জন, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৮,৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৮১১ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
ঢাকাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি
শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি অকালমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়, যেখানে বছরে প্রায় ৬৮,৭০৩ জন মারা যাচ্ছেন। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১১,২০২ জন), রাজশাহী (২,৮২৭ জন), খুলনা (২,৬২৫ জন), সিলেট (১,৪৮৮ জন) এবং বরিশাল (১,৩৯৫ জন)।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ছয়টি শহরেই পিএম ২.৫ দূষণজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ঢাকায়, যেখানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩,৪৮৪ জন করে অতিরিক্ত অকালমৃত্যু যুক্ত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা নগরাঞ্চলে বায়ুদূষণের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমরা প্রায়ই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, এর ফলে বছরে প্রায় ৮৮,০০০ অকালমৃত্যু এবং জিডিপির প্রায় ৫% সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।”
তিনি বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুর গুণগত মানসংক্রান্ত নির্দেশিকা বাস্তবায়ন, বিভিন্ন উৎস থেকে পিএম ২.৫ নির্গমন কমানো, নগরাঞ্চলে সমন্বিত বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”