জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর করছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে এ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে বা এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০% শুল্ক প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে, যেসব দেশ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি, তাদের জন্য শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১২.৫%।
বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশ ১০% শুল্কের আওতায় পড়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ডসহ কিছু অর্থনীতির নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ (এমএফএন) শুল্কের অতিরিক্ত ১০ বা ১২.৫% সেকশন ৩০১ শুল্ক আরোপ করা হবে। তদন্তভুক্ত অন্যান্য অর্থনীতির জন্য ১২.৫% শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে অস্থায়ীভাবে আরোপ করা ১০% শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকেই নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে। এর আগে হোয়াইট হাউস জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ দেশগুলোর ওপর ১০ থেকে ১২.৫% শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, “আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাণিজ্য বিকৃতির মতো বিষয়গুলোর সংশোধন শুরু করবে, যা শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।”
গ্রিয়ার ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ প্রয়োগ করেছেন, যা মার্কিন বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত করে এমন বিদেশি বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের ভাষ্য, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যেগুলো দেশটির মোট আমদানির প্রায় ৯৯.৪% প্রতিনিধিত্ব করে।
কার্যালয়টি আরও জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যে দেশগুলো এ ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে অঙ্গীকার করেছে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছে, তারা কম হারের শুল্ক সুবিধা পাবে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির নতুন ধাপ
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে শুল্কনীতি জোরদার করেন। তিনি বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তার দাবি ছিল, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মার্কিন শিল্প ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, জরুরি ক্ষমতার আওতায় প্রেসিডেন্টের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্কের আইনি ভিত্তি ছিল না। আদালতের ওই রায়ের পর কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আদায় করা কয়েক হাজার কোটি ডলার ফেরত দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক আরোপের বিকল্প আইনি পথ খুঁজতে শুরু করে, যার অংশ হিসেবে সেকশন ৩০১-এর আওতায় নতুন এই শুল্ক কার্যকর করা হলো।
এর আগে চলতি সপ্তাহে কানাডার পণ্যের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপে ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের সেকশন ৩৩৮ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে ব্রাজিল ও কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর পৃথক শুল্ক আরোপ এবং চীনের সঙ্গে চলমান শুল্ক উত্তেজনাও বহাল রয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাবের আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা কফি, মাইক্রোওয়েভসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। কারণ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।
এছাড়া শ্রমনীতি ও মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন এই শুল্ক ব্যবহার করছে বলেও বিশ্লেষকদের ধারণা। এর জবাবে কয়েকটি দেশ আইনি পদক্ষেপ অথবা পাল্টা শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
বর্তমানে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা-সংক্রান্ত তদন্তও চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত শেষে চলতি বছরের শেষ দিকে এসব দেশের ওপর আরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ককে ‘অন্যায্য ও খামখেয়ালিপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে ব্রাজিল। দেশটির সরকার জানিয়েছে, শ্রমিকদের অধিকার ইস্যুকে সুরক্ষাবাদী বাণিজ্য নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। ব্রাজিল আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প রপ্তানি বাজার খুঁজবে বলেও জানিয়েছে।
জাপান সরকার নতুন শুল্কে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, তাদের বাণিজ্য আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল এই শুল্ককে ‘সম্পূর্ণভাবে অন্যায্য’ উল্লেখ করে অস্ট্রেলীয় পণ্যের ওপর আরোপিত সব শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।