ঢাকার সাভারে ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাট, উল্টোপথের যানবাহনসহ নানাভাবে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় সড়কে তীব্র যানজটে আটকা পড়ে সড়কেই সন্তান প্রসব করেছেন এক নারী।
সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে ভুক্তভোগী নারীর স্বামী পোশাককর্মী মো. আমীর হামজা জানান, তার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময় হতে এখনও দুই মাস বাকি ছিল। ফলে এমন পরিস্থিতির কোনো প্রস্তুতিই তাদের ছিল না।
রবিবার (২ আগস্ট) সন্ধ্যায় ঢাকার সাভারের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী নারীর নাম মোসা. রাজিয়া খাতুন (৩২)। তিনি স্বামীর সঙ্গে সাভারের পৌর এলাকার ভাটপাড়ায় বসবাস করেন।
জানা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে ওই নারীর স্বামী পার্শ্ববর্তী একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ছুটে গিয়ে হাসপাতালে দায়িত্বরতদের কাছে নিজেদের এমন অসহায়ত্বের বিষয়টি তুলে ধরলে হাসপাতালের লোকজন স্ট্রেচার নিয়ে ছুটে গিয়ে সড়ক থেকে ওই নারী ও নবজাতককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা ওই নারীর প্লাসেন্টা অপসারণ করেন।
এ ঘটনার পর ভুক্তভোগী ওই নারীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও নবজাতকটি প্রিম্যাচিউর হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজিয়া খাতুন বলেন, “গতকালের অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দিনে বাসায় একাই ছিলাম। ব্যথা নিয়ে সারাদিন কাটিয়েছি। পরে আমার স্বামী কারখানা থেকে ফেরার পর আমাকে নিয়ে রিকশায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যায়, কিন্তু ততক্ষণে আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। পরে এই হাসপাতালে আসার পথে জ্যামে আটকা পড়ি। একপর্যায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে রাস্তাতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর আর কিছু মনে নেই।”
রবিবার দুপুরে কারখানায় কর্মরত অবস্থায় আমীর হামজাকে মোবাইল ফোনে তার স্ত্রী পেটে ব্যথার কথা জানান। স্ত্রীর অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চাইলে কারখানার লাইন চিফ তা দিতে অসম্মতি জানান। পরবর্তীতে কারখানার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানালে বিকেল ৫টা নাগাদ ছুটি নিয়ে বাসায় যান তিনি।
আমীর হামজা বলেন, “বাসায় ফেরার পর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা দেখে দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখাতে একটি রিকশায় উঠিয়ে সাভারের শিমুলতলার একটি ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টারে নিয়ে যাই। ততক্ষণে তার ব্যথা আরও তীব্র হয়। এ সময় এই পরিস্থিতি দেখে সেখানকার দায়িত্বরতরা তাকে দ্রুত একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে আবারও তাকে রিকশায় উঠিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগরগামী সার্ভিস লেন ধরে উল্টোপথে কাছেই অবস্থিত সুপার মেডিকেল হসপিটালের উদ্দেশে রওনা হই। পথে রিকশা সাভার বাসস্ট্যান্ডের সিটি সেন্টারের সামনে এলে সেখানে তীব্র যানজট থাকায় আমরা আর এগোতে পারছিলাম না। ওখান থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের পথ হলেও সেখানেই ১০ থেকে ১৫ মিনিট আটকে থাকতে হয়। ততক্ষণে আমার স্ত্রীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়ে। এ সময় আশপাশের লোকজনের কাছে সহযোগিতা চেয়েও কারও সহযোগিতা পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেই যে, তাকে (রাজিয়া খাতুন) কাঁধে করেই হাসপাতালে নিয়ে যাব। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ও আমার সঙ্গে থাকা এক আত্মীয়া মিলে তাকে ধরে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রচণ্ড প্রসবব্যথা ও যন্ত্রণায় চিৎকার করতে সেখানেই তিনি সন্তান প্রসব করেন এবং সন্তান প্রসবের পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।”
হামজা বলেন, “এ ঘটনার পর কেউ একজন একটি চাদর দিলে সেটি দিয়েই স্ত্রীকে ঢেকে রেখে আমি দৌড়ে সুপার মেডিকেলে গিয়ে সেখানকার দায়িত্বরতদের বিষয়টি জানালে সেখানের লোকজন দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে গিয়ে আমার স্ত্রীকে সড়ক থেকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করে।”
তিনি বলেন, “এমন এক দেশে বসবাস করি, যেখানে এমন জরুরি পরিস্থিতিতেও একজন মুমূর্ষু রোগী নিয়ে সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া যায় না। এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়, শত শত মানুষ সেখানে আমাদের এমন অসহায়ত্ব দেখেও কেউ এগিয়ে আসছিল না আমাদের হাসপাতালে পৌঁছাতে সহযোগিতা করতে।”
হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, “খবর জানার পর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লোকজনকে স্ট্রেচারসহ পাঠিয়ে নবজাতকসহ ওই নারীকে উদ্ধার করে আমাদের হাসপাতালে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। সে সময়ও ওই নারীর প্লাসেন্টা যুক্ত ছিল। পরে দায়িত্বরত চিকিৎসক প্লাসেন্টা রিমুভ করেন। এখন মা ও সন্তান উভয়ের শারীরিক অবস্থা যদিও স্থিতিশীল রয়েছে, তবে শিশু প্রিম্যাচিউর হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে।”
হাসপাতালটির আরেক ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রোড ডিভাইডার দেওয়ার পর থেকেই মানুষের ভোগান্তি তীব্র হয়েছে। কাছাকাছি কোথাও ইউটার্নের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পথ ঘুরে মানুষকে তার গন্তব্যে যেতে হয়। অন্যদিকে সার্ভিস লেনের ফুটপাতে অবৈধ দোকানপাট, পার্কিংয়ের দখলে থাকায় এবং উল্টোপথের যানবাহন, বিশেষ করে অটোরিকশার কারণে সড়কে এত বিশৃঙ্খলা হয় যে, দুই মিনিটের পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টাও অপেক্ষা করতে হয়।”
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, “সড়কে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসবের পেছনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। মানুষের সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। অবৈধ পার্কিং করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। যেহেতু বিষয়টি নজরে আনলেন, আমি আমাদের ট্রাফিক ডিপার্টমেন্টকে নির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছি, যেন তারা আরও সতর্ক হন এবং এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।”