‘রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় পুলিশের চিত্রনাট্য ভালো, কিন্তু মানুষ পছন্দ করেনি’

রংপুর নগরীর মাসুয়াপাড়া মহল্লায় সদ্য অবসরে যাওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও ২ সন্তানসহ ৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে পুলিশের সাজানো নাটক বলে অভিযোগ করছেন জেলাটির বিশিষ্ট নাগরিকরা। 

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ১২ টার দিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে রংপুর নগরীর প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে দেখা যায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। 

এসময় আগামী ৩ দিনের মধ্যে প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা না হলে রংপুর নগরী অচল করে দেওয়ার আল্টিমেটামও দেয় তারা। 

একই অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ  করেছে জেলাটির মহিলা পরিষদ ও নাগরিক কমিটি।

তাদের দাবি, স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মরদেহ শনিবার রাতে উদ্ধার করা হয়। প্রকৃত ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২ যুবককে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং বলা হয় ইয়াবা সেবন করতে বাধা দেওয়ার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড, এগুলো সবই পুলিশের সাজানো নাটক। 

এর আগে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক শিক্ষার্থীরা জিলা স্কুল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এসে স্কুলের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। এসময় সড়কের দুইপাশে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

এসময় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান, সাবেক শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক কর্মী ডলারসহ অন্যান্যরা বক্তব্য দেন। 

সমাবেশে সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, “রংপুর জিলা স্কুলের সদ্য অবসরে যাওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার একমাত্র ছেলে রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়াম চক্রবর্তী ও তার মা প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও  স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী প্রার্থী চক্রবর্তীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। দু’দিন তাদের মরদেহ বাড়িতে পড়ে থাকলো। ২ দিন পর শনিবার রাতে ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করলো পুলিশ। এরপর হঠাৎ শুনলাম হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি দুই খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। রবিবার পুলিশ কমিশনার আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলন করে বললেন, খুনিরা নাকি বৃহস্পতিবার রাতে নিহত স্কুল শিক্ষক গণপতির বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়ায় তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। ২ জন মাদকসেবী পরপর ৪ জনকে হত্যা করলো পুলিশের এমন গল্প পাগলেও বিশ্বাস করবে না।”

“পুলিশ কমিশনার আরও বললেন,হত্যাকারীরা নাকি ৪ জনকে খুন করে ওদের বাসায় গোসল করেছে খেজুর আর ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছে। তার পর যাতে কেউ বুঝতে না পারে সে জন্য তাদের দুটি মোবাইল ফোন পানিতে ডিজারজেন্ট দিয়ে গুলিয়ে ফেলে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার জুম্মার নামাজ পর্যন্ত তারা বাসায় অবস্থান করেছে। এ ঘটনা আমরা বিশ্বাস করি না। পুরো ঘটনা সাজানো। সে কারণে আমরা প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে ঘটনার নেপথ্যে কারা সব বের করার দাবি জানাই।”

সমাবেশে সাবেক শিক্ষার্থী শরিফুল বলেন, “পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারি না। তিনি বলেছেন, গণপতি স্যারের মেয়ে প্রার্থীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর তার চোখ বের হয়েছিলো, চোয়াল ভেঙে গেছিলো। কিন্তু ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বললেন, তার চোয়াল ভাঙেনি, চোখও বের হয়নি। তাহলে আমরা কীভাবে পুলিশের কথা বিশ্বাস করবো?”

সমাবেশে সাবেক শিক্ষার্থী সাংস্কৃতিক কর্মী ডলার বলেন, “আমাদের শ্রদ্ধেয় স্যার ও তার ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানসহ ৪ জনকে ২ যুবককে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করলো, পুলিশ কমিশনার সাহেবের এ বক্তব্য আমরা বিশ্বাস করি না। ৩ দিনের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা না হলে, আমরা রংপুর নগরী পুরোপুরি অচল করে দেবো।”

এদিকে একই দাবিতে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের উদ্যোগে রংপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহিলা পরিষদের রংপুর জেলা সভাপতি রুমানা জামান অভিযোগ করেন, “নগরীতে ৪ জন খুনের ঘটনায় পুলিশ যে গল্প বানিয়েছে তার চিত্রনাট্য ভালো হয়েছে, তবে গল্পটা রংপুরের মানুষ একেবারে পছন্দ করে নাই। পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে যা বললেন তা আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না।”

এসময় তিনি আরও বলেন, “দুইজন কয়েক মিনিটে ৪ জনকে খুন করলেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, এসব কথা নাটকে মানায় বাস্তবে নয়।” তিনি দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করার দাবি জানান।

এদিকে একই দাবিতে বিকেলে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন  ও বিক্ষোভ করেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। 

সমাবেশে নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, “সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে খুনের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে।”

তিনি চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটির বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।

রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেছিলেন, স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর কন্যা প্রার্থী চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করার সময় তার চোয়াল ভেঙ্গে গেছে চোখ বের হয়ে গেছে। 

পরে এ বিষয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজের ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, “মেয়েটির চোয়াল ও চোখ বের হয়নি। তবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর মূল কারণ বলা সম্ভব নয়। তবে ৪ জনের মুখে বা শরীরে এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার কোনো আলামত মেলেনি।”