নদী খনন না করায় দেরিতে পানি নিষ্কাশনের ফলে পিছিয়ে যাচ্ছে বোরো আবাদ। শুষ্ক, পানিশূন্য নদনদীর কারণে সেচ সংকট এবং হাওর-নদী সমান্তরাল অবস্থনের কারণে কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জে কয়েক লাখ কৃষক প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়েন। ত্রিমুখী সংকট থেকে পরিত্রাণ চান কৃষকরা।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বোরো ফসল উৎপাদন হয় সুনামগঞ্জ জেলায়। এ জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষক প্রতিবছর ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া ফসল কেটে গোলায় তুলতে পারলে সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াপদা দীর্ঘ ছয় দশক ধরে আগাম বন্যা ঠেকাতে মাটির বাঁধ নির্মাণ করলেও নদী খনন না করায় ত্রিমুখী সংকটে দিশেহারা কৃষক। ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ১৯৯০,১৯৯৪,২০০৪, ২০১০,২০১৬,২০১৭ ও ২০২২ সাল পর্যন্ত সাতবার বাঁধ ভেঙে হাওরে ফসল ডুবির ঘটনা ঘটে। এতে হাজার কোটি টাকা ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। নিঃস্ব হন জেলার ৪ লাখ ক্ষুদ্র মাঝারি, প্রান্তিক ও বড় কৃষক।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে হাওর ও নদীর পানির স্তর সমান্তরাল থাকায় জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান। বছরে দুবার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বছরের পর বছর নদী খনন না করায় হাওরের পানি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে দেখা দেয় সেচ সংকট, এতে বীজতলার চারারোপণ করতে ১৫ দিন সময় বেশি লাগে। আর চৈত্রের শেষ সপ্তাহ থেকে বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় ক্ষেতের কাঁচা ধান। দেখা দেয় সেচ সংকট।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদী খনন না করে প্রতি বছর শত কোটি টাকা ব্যয়ে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করলেও এই বাঁধ এখন কৃষকের গলার কাটা।
গেল কয়েক বছর যাবত জলাবদ্ধতা দেরিতে পানি নিষ্কাশন ও সেচ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। গেল বোরো মওসুমে জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমির কাচা ধান পানিতে তলিয়ে যায় এতে লক্ষাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষিপঞ্জিকা অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে বোরো আবাদের প্রস্তুতি চলবে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নদী খনন প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় এবারও ত্রিমুখী সংকটের শংকায় আছেন লাখো কৃষক।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক সফর উদ্দিন (৬৬) বলেন, “সময়মতো হাওরের পানি নদীতে নামে না তাই ১৫ দিন পরে শুরু হয় ক্ষেতরোয়া (চারা রোপণ)। এর মধ্যে পাওয়া যায় না সেচের পানি আর বৈশাখের শুরুতে সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ক্ষেতের কাঁচা ধান। গেল কয়েক বছর ধরে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দেরিতে চারা রোপণ করলে আগাম বন্যার ভয়, চারা রোপণের সময় সেচ সংকট আর কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে গেলে কৃষকরা কিভাবে জমি চাষবাস করবেন।”
সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান জানান, গেল বার ধারদেনা করে তিনি ৬ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেন। কিন্তু বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায় পুরো ক্ষেত। এক বছরের জের তিন বছরে টেনেও শেষ করতে পারেন না কৃষক।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, “প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে জেলার ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে চলতি, খাসিয়ামারা, যাদুকাটা, চেলা, সোনালি চেলা, মৌলা নদী সহ ৮টি আন্তঃসীমান্ত নদী ও শতাধিক পাহাড়ি ছড়ায় প্রবল বেগে মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলের পানি আপার স্ট্রিম থেকে ডাউন স্ট্রিমে প্রবাহিত হয়। এছাড়া সিলেটের বেশির ভাগ নদীর পানি সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধনু নদীর মাধ্যমে ভৈরবে মেঘনা নদীর মাধ্যমে সাগরে প্রবাহিত হয়। বছরের পর বছর নদী খনন না করায় নদীগুলো বর্ষায় পানিতে থৈ থৈ করলেও শুষ্ক মওসুমে বেশিরভাগ নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এসব কারণে হাওরের পানি নিষ্কাশন সিস্টেম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় প্রতিবছর কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।”
জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, বান-বন্যা হলে মন্ত্রীরা স্পিডবোটে হাওরে ঘুরে বেড়িয়ে ত্রাণ বিতরণ করেন যাওয়ার সময় বলে যান নদী খননের কথা, অফিসে যাওয়ার পর নদী খননের কথা বেমালুম ভুলে যান। গেল ১৭ বৎসর আমরা এমন চিত্র দেখেছি।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওবাইদুল হক মিলন বলেন, দুর্যোগের সময় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড সবাই নদী খননের কথা বলেন। তবে বছরের পর বছর চলে গেলেও খনন প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না। দ্রুত নদী খননের কাজ শুরুর দাবি করছি।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪২৯ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সুরমা,কুশিয়ারা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা,আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, চামতি দাড়াইন, আবুয়া, পাটলাই, কাউনাই সোমেশ^রী সহ ১৩ নদীর ৩০৪ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এখনও প্রকল্পটি অনুমোদন হয়নি। এটি অনুমোদন হলে হাওরের পানি নিষ্কাশন ও সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতা কমে আসবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, জেলার ১২ উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০৬টি নদনদী রয়েছে। প্রতিবছর ভরাবর্ষায় নদীতে পানি থাকলেও শুষ্ক মওসুমে ছোটবড় ৭০টি নদী শুকিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জ থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের বৃষ্টিপাত বহুল ভারতের চেরাপুঞ্জির দূরত্ব মাওসিনরাম। উজানে ভারত আর ভাটিতে সুনামগঞ্জ তাই দ্রুত উজানের পানি ভাটিতে এসে আগাম বন্যার সৃষ্টি করে। পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগাম বন্যায় হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।