লোডশেডিং বাড়ছেই, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বরাদ্দও কমেছে

মাঝারি তাপমাত্রার আবহাওয়া বিরাজ করলেও সারা দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে অনেক ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার আগে সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের বৃহস্পতিবারের পর্যালোচনা অনুযায়ী, সারা দেশে লোডশেডিং গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি রয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা ৩টায় লোডশেডিং ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৩ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে গ্যাসের তীব্র সংকটের সময়ও লোডশেডিং ঘণ্টায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এবার শুধু গ্রাম বা মফস্বল নয়, রাজধানীর বাসিন্দারাও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়ছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টায় ঢাকার ডেসকো এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ডিপিডিসি এলাকায় ১ হাজার ৯৯৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১৬৫ মেগাওয়াট।

একই সময়ে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় চাহিদা ছিল ২ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ৪৩৭ মেগাওয়াট। তবে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পালা করে দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বুধবার ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর ছুটির দিনেও কোনো কোনো এলাকায় টানা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। গ্রামাঞ্চলেও কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তির পর ফের দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ গ্যাসচালিত। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব কেন্দ্রের অনেকগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি বাড়ছে।

পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। সীমিত সরবরাহের অবশিষ্ট গ্যাস বাণিজ্যিক গ্রাহক ও সার কারখানাগুলোতেও দেওয়া হচ্ছে।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। কয়েক সপ্তাহ ধরে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছিল। বর্তমানে উৎপাদন আরও কমিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামানো হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। আগে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও এখন তা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মু. শোয়েব জানান, ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। তবে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে আসছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

সর্বশেষ কেনাকাটায় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ২৪ ডলার পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে এ দাম ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৩ ডলার। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্ববাজার থেকে কেনা প্রতি ঘনফুট এলএনজির দাম প্রায় ৭৫ টাকা পড়ছে। সেই গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ১৪ টাকা দরে সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসে এক বছরের জন্য বরাদ্দ করা ভর্তুকির অর্থ গত দুই মাসেই খরচ হয়ে গেছে। সরকার এখন তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার উৎস খুঁজছে।