স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মধ্যেও সিলেটের বিয়ানীবাজারে সোনাই নদে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের বাহাদুরপুর এলাকায় এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলেও ফাইনাল খেলা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। অন্ধকার নেমে আসায় প্রতিযোগিতা মাঝপথে শেষ করে দেওয়া হয়, পরে বৈঠক করে বিজয়ী নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
বিকেল সোয়া চারটার দিকে লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে শুরু হয় এই নৌকাবাইচ, যেখানে অংশ নেয় তিনটি নৌকা গোলাপগঞ্জের কালীজুরির “পাগলা নাও”, হাকালুকির “বাঘ নাও” ও বড়লেখার ঘোড়াকান্দির “স্বাধীন বাংলা নাও”। সোনাই নদের তৃগাংগারমুখ এলাকায় অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নৌকার জন্য পুরস্কার রাখা হয় একটি বড় আকারের গরু, আর দ্বিতীয় স্থান অধিকারী নৌকার জন্য একটি রেফ্রিজারেটর।
প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই সোনাই নদের দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো দর্শক। সংকেত পাওয়ামাত্র নৌকাগুলো ছুটে চলে নদের পানিতে, মাঝিদের সমন্বিত বৈঠার ছন্দে উত্তাল হয়ে ওঠে নদ। শিশু-নারীসহ সববয়সী মানুষ নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেন, অনেকে মুঠোফোনে ছবি-ভিডিও ধারণ করেন। নিরাপত্তার জন্য নৌকাবাইচ চলাকালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদে টহল দেন পুলিশ সদস্যরাও।
আয়োজকদের একজন জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে সোনাই নদে এই নৌকাবাইচের আয়োজন হয়ে আসছে। তবে এবার স্থানীয় কিছু মানুষ এতে আপত্তি জানান। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে “তৌহিদি জনতা”র ব্যানারে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালান এবং বারইগ্রাম বাজার মসজিদে একই ব্যানারে সভা করে হুঁশিয়ারি দেন। ওই সভার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে বক্তারা নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে অতীতে মারামারি-সংঘর্ষ, নদীর পাড় ও আবাদি জমির ক্ষতি এবং যানজটের মতো সমস্যার কথা তুলে ধরে আয়োজন বন্ধ রাখার দাবি জানান।
অন্যদিকে আয়োজকদের দাবি, নৌকাবাইচ সোনাই নদ ও স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, যা প্রতিবছর এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি করে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া এলাকার অধিকাংশ মানুষই এই আয়োজনের পক্ষে বলে দাবি করেন তারা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, “নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এবং এটি ধর্মবিরোধী কোনো কাজ নয়, তাই এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে এবং প্রতিবছর ঐক্যবদ্ধভাবে এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, শুকনা মৌসুমে এলাকার ভাঙা রাস্তাগুলোর সংস্কারকাজ করা হবে এবং নদীভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে, যার কাজ এ বছরই শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা মজুমদার। এ ছাড়া বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ রেজা ও বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। বক্তারা সবাই গ্রামীণ ঐতিহ্য নৌকাবাইচ টিকিয়ে রাখা এবং ভবিষ্যতেও এর আয়োজন অব্যাহত রাখার কথা জানান।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, তিনটি নৌকা নিয়ে তিন ধাপে প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা ছিল লটারির মাধ্যমে প্রথম রাউন্ডে দুটি নৌকা লড়বে, বিজয়ী সরাসরি ফাইনালে যাবে, আর হেরে যাওয়া নৌকা দ্বিতীয় রাউন্ডে লড়বে তৃতীয় নৌকার সঙ্গে, যার বিজয়ী উঠবে ফাইনালে। শেষ পর্বে গোলাপগঞ্জের “পাগলা নাও” ও হাকালুকির “বাঘ নাও” প্রতিযোগিতায় নামলেও অন্ধকার নেমে আসায় ফাইনালের বাইচ আর সম্পন্ন হয়নি।
এ বিষয়ে বাইচের আয়োজক কমিটির সঙ্গে থাকা বিয়ানীবাজারের মোল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান বলেন, “ফাইনালের সিদ্ধান্ত এখনো মীমাংসা হয়নি, পরবর্তী সময়ে বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”