অটোরিকশায় কিউআর কোড, ট্র্যাকিং-কী থাকছে নতুন নীতিমালায়?

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শৃঙ্খলার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর (মহিলা আসন-৪) মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তিনি বলেন, “অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যার আওতায় প্রতিটি অটোরিকশা ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হবে ফলে একটি নম্বরের অধীনে একাধিক অটোরিকশা অবৈধভাবে চালানোর সুযোগ থাকবে না।”

স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি এই নীতিমালায় চালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বদলে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ব্যাপারেও কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে নীতিমালায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি শুধু ঢাকাতেই অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার। এই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলে জানান তিনি, তবে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে।

মন্ত্রী বলেন, “গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকসহ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান গ্রামীণ ও নগর পরিবহনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাসহ বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। তবে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।”

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১ জন যার মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

এর আগে নোটিশ উপস্থাপনকালে রেহানা আক্তার রানু জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি এআই ট্রাফিক ক্যামেরার সুবাদে লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গতিসহ নানা অনিয়ম অনেকটাই কমেছে। কিন্তু অটোরিকশায় নম্বরপ্লেট না থাকায় অনিয়ম শনাক্ত হলেও জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে অটোরিকশা মানুষের কাছে জনপ্রিয়, তাই এটি পুরোপুরি বন্ধ না করে নম্বরপ্লেট, চালক প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

সম্পূরক প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করেন, অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার দাবি তিনি করেননি; বরং জব্দ ও ডাম্পিংয়ের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎচালিত চার্জিং অবকাঠামো, বিআরটিএ নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক রিকশা চলাচল ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। বিদ্যমান ১৭ সিগন্যালের ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে, যা পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারিত হবে। তিনি জানান, অটোরিকশা বন্ধ নয় বরং একে নিবন্ধিত, ডিজিটাল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থার আওতায় আনতে চায় সরকার জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সংশ্লিষ্টদের কর্মসংস্থান বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।