আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (ইউএন ট্যুরিজম) দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, “ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনকে নতুনভাবে সাজানো”।
ভ্রমণ এখন আর শুধু নতুন কোনো জায়গা ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, মানুষের জীবনযাত্রা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ। একই সঙ্গে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা, গন্তব্য নির্বাচন ও অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন আনছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই পরিবর্তনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করেছে। শোভাযাত্রা, সাইকেল র্যালি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সিটি ট্যুর, পর্যটন খাতের অংশীজন ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রদর্শনী, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে এসব আয়োজনে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবন থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হবে। র্যালিতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য এবং ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাস তুলে ধরবেন পর্যটন খাতের অংশীজনরা। এরপর সাইকেল শোভাযাত্রার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি গাইডেড সিটি ট্যুরের আয়োজন করবে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি)। এর মাধ্যমে শিশুরা রাজধানীর বিভিন্ন পর্যটন আকর্ষণ ঘুরে দেখার সুযোগ পাবে।
আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যটন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যটক-উৎস দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের আয়োজন করা হবে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে পর্যটন সহযোগিতা বাড়ানো এবং আরও বেশি বিদেশি পর্যটককে বাংলাদেশ ভ্রমণে আকৃষ্ট করার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।
সপ্তাহব্যাপী আয়োজনের মূল অনুষ্ঠান হবে ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। সেখানে ১২টি বিষয়ভিত্তিক স্টলে বাংলাদেশের খাবার, ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য, কারুশিল্প, বস্ত্র, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য তুলে ধরা হবে। প্রযুক্তি ও পর্যটনের সমন্বয় তুলে ধরতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতাও দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
এবার প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’। টেকসই পর্যটন, উদ্ভাবন, সেবার মান, ডিজিটাল রূপান্তর, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৩টি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার দেওয়া হবে।
সম্ভাবনা বড়, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং অসংখ্য পর্যটন গন্তব্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম; ৭-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৩ দশমিক ৩৪। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং দুর্বল হওয়া এর অন্যতম কারণ। বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় ইতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোও জরুরি।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ভূঁইয়ার মতে, বিদেশে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যে ধরনের ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন, তা এখনো যথেষ্ট হচ্ছে না। দেশে পর্যটক আকর্ষণের মতো অনেক স্থান থাকলেও অনেক জায়গায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান শরীফুল আলম খন্দকারও পর্যটনকে একটি সমন্বিত খাত হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি যোগাযোগ, আইনশৃঙ্খলা, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ ও হসপিটালিটি সেবার উন্নয়ন প্রয়োজন। এ কাজে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত ট্যুরিজম ওয়াচ অনুযায়ী, বৈশ্বিক পর্যটন খাত প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় পুনরুদ্ধারের গতি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দুর্বল ও অসম। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আকাশপথের যোগাযোগ, আঞ্চলিক হাবের বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটকপ্রবাহে পড়েছে।
নতুন করে বড় পরিকল্পনা
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের পর্যটন খাত সম্প্রসারণে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নতুন করে ৬০টি প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। দেশের আটটি পর্যটন অঞ্চলে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
দর্শনার্থীদের মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৯% গেছে আবাসনে। খাবার ও পানীয়তে ১৯% কেনাকাটা ও অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ১৩ শতাংশ এবং পরিবহনে ৬% ব্যয় হয়েছে। ফলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো গেলে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় পণ্য, কারুশিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর সুফল ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের চা-বাগান ও হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি প্রকৃতি থেকে শুরু করে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন-পর্যটন গন্তব্যের বৈচিত্র্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিস্তৃত। তবে সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সহজ ভিসা ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ, মানসম্মত সেবা, নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ব্র্যান্ডিং।
এ বছরের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য সেই প্রচেষ্টায় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করার নতুন সুযোগ সামনে এনেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর কার্যকর প্রচার, এআইভিত্তিক ভ্রমণ তথ্য ও পরিকল্পনা, ভার্চুয়াল ট্যুর এবং পর্যটকদের জন্য সহজ ডিজিটাল সেবা চালু করা গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।