১৬ বছরেও কাটেনি গোবিপ্রবির আবাসন সংকট, ৭৬% শিক্ষার্থীই হলের বাইরে

১৬ বছর পেরিয়ে ১৭ বছরে পড়েছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি)। এর মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি আবাসন সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ৯,৩২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলে মাত্র ২,১৬০ শিক্ষার্থী সিট পেয়েছে। ৭,১৬০ শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। হলে থাকছেন ২৩.১৮% শিক্ষার্থী। আর বাইরে থাকছেন ৭৬.৮২%  শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে জানাগেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি অনুষদের অধীনে ৩৩টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব বিভাগে ৯,৩২০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এ কারণে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। সে অনুপাতে আবাসিক হলের আসন সংখ্যা বাড়েনি। 

ওই দপ্তর থেকে আরও জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর মধ্যে বিজয় দিবস হলে ৪০০টি, স্বাধীনতা দিবস হলে ৩৬২টি, শহীদ তিতুমীর হলে ৬০৮টি, বনলতা হলে ৩৪০টি এবং অপরাজিতা হলে ৪৫০টি আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচটি হলে মোট আসন ২,১৬০। হলগুলোর মোট আসনসংখ্যা বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭৬.৮২% শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধার বাইরে রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসিক হলের পর্যাপ্ত আসন না থাকায় বিকল্প হিসেবে মেসে থাকতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের আবাসন চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে মেস ব্যবসা গড়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ভাড়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং মেস মালিকদের বিভিন্ন ধরনের শর্ত মেনে নিয়েই থাকতে হচ্ছে তাদের। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

একাধিক শিক্ষার্থী জানান, প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মেস বা ভাড়া বাসার অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের হলেও এর স্থায়ী সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ও ভবিষ্যৎ ভর্তি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ এবং বিদ্যমান হলগুলোর আসনসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী লাবিবা তাসফিয়া বলেন, “মেয়েদের জন্য আবাসিক হলে আসন ৮শ’ টিরও কম, যা শিক্ষার্থীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এর ওপর একটি ছাত্রী হল এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে আমাদের অনেককেই বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় এক ধরনের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কাজ করে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কার্যক্রম শেষে বাসায় ফেরার সময়। পরিবারের কাছেও বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে। তাই মেয়েদের জন্য দ্রুত নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি অসম্পূর্ণ হলটি সম্পূর্ণ করে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অনাবাসিক শিক্ষার্থী রেদোয়ান ইসলাম সিয়াম বলেন, “আবাসন সংকট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। হলে আসন না পাওয়ায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতসহ অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগে থাকতে হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অনুষ্ঠান বা কার্যক্রম শেষে বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না। আবাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীর নিরাপদ ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান আসনের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বণ্টন এবং বিকল্প আবাসন ব্যবস্থার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবস হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় পাঁচটি আবাসিক হলে আসনসংখ্যা অনেক কম। ফলে চাইলেও অনেক সময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে এলেও আসন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। বিষয়গুলো আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। আমার মনে হয়, ছেলেদের জন্য আরও তিনটি এবং মেয়েদের জন্য দুটি হল নির্মাণ করা গেলে আবাসন সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সোহেল হাসান বলেন, “২০১০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এখনো মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন - বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আবাসন সংকট সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে একটি একাডেমিক ভবন, অডিটরিয়াম, একটি ছেলেদের হল ও একটি মেয়েদের হল নির্মাণের জন্য আবেদন করেছি। ইউজিসি থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আবাসন সংকট অনেকটা নিরসন  হবে।”

তিনি আরও বলেন, “দ্বিতীয় ধাপের ২৫৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০২৪ সাল থেকে ঝুলে আছে। ওই প্রকল্পের আওতায় একটি ছাত্রী হলের উপরের তলার কাজ এখনো বাকি রয়েছে। কাজটি সম্পন্ন করা গেলে সেখানে আরও প্রায় ১০০ ছাত্রী আবাসিক সুবিধা পাবে। আশা করছি, এসব কাজ ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”