সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উসকানি দিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর পুলিশি অভিযানে এজাহারভুক্ত ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন এবং অন্য আসামি আসাদুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মামলার এজাহার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বচসায় জড়িয়ে গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই কথাবার্তার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অডিওতে কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভ করে ‘তৌহিদী জনতা’কে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর উত্তেজিত জনতা শামীমের বসতবাড়ির গেট ভাঙচুর করে তাকে বাজারে এনে মারধর করে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করেন। রাতে স্থানীয় কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে তার পাকস্থলী ওয়াশ করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ১৩ অক্টোবর রাতে ফজলুল হক আমিনী ও তার অনুসারীরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে আবারও গণপিটুনি দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে হামলা থামেনি। আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক হাসপাতালে গিয়ে হামলা চালায় এবং চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছাড় মেরে বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর অভিযোগ করে বলেন, “এই অডিও প্রথমে স্থানীয় জামায়াত অফিসে নিয়ে তাদের শোনানো হয়। এরপর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর একদল নেতাকর্মী লোক জড়ো করে প্রথম ‘মব’ সৃষ্টি করেছিল।”
তবে এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী। তিনি বলেন, “চিকিৎসকের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। এতে জামায়াতের কোনো দলীয় সম্পৃক্ততা ছিল না, এলাকাবাসি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”
এদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির দেবহাটা উপজেলা শাখার সেক্রেটারি এইচ এম এমদাদুল হক। এক প্রতিবাদলিপিতে তিনি উল্লেখ করেন, শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী বা এর কোনো নেতাকর্মীর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।
তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করে জনতা জড়ো করার কথা নিজ মুখে স্বীকার করলেও এবং প্রশাসনকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানালেও এখনও পর্যন্ত গ্রেপ্তার হননি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মামলা দায়েরের পর পুলিশ ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তিনি বলেন, “প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনীসহ অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুতই বাকিদের আইনের আওতায় আনা হবে।”