জার্মান বাতির কথা বলে রংপুরে লাগানো হলো নিম্নমানের চীনা বাতি

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে ৫০ কোটি টাকা ব্যায়ে সর্বাধুনিক জার্মান অথবা ফ্রান্সের তৈরি এলইডি বাতির কথা বলে চীনের তৈরি নিম্নমানের বাতি লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আট মাস না যেতেই অনেক সড়কবাতি বিকল হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে নিম্নমানের এসব লাইটপোষ্ট অপসারন করতে চিঠি দেওয়া হলেও এখনও অপসারন কাজ শুরু হয়নি।

সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এসব সড়কবাতি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুই দফায় চিঠি দেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস হতে চললেও এখনও অপসারন করা হয়নি। বর্তমানে এসব সড়কবাতির অনেকগুলোই বিকল হয়ে গেছে। সন্ধার পর সড়কের অনেক জায়গায় বাতি চলছে না। এরপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ছয় হাজার ৬০০ বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সাত হাজার ৭০০টি এলইডি বাতি লাগানোর কথা। প্রতিটি বাতি ৩৬ থেকে ৬০ ওয়াট হওয়ার কথা ছিল। দরপত্রে উল্লেখ করা ছিল, বৈদ্যুতিক বাতিগুলো জার্মানি অথবা ফ্রান্সের তৈরি হতে হবে।

সরেজমিনে শহরের শাপলা চত্বর, কাচারিবাজার, মেডিকেল মোড়, পায়রা চত্বর, কলেজ রোড, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও প্রেসক্লাব চত্বরসহ আরও কিছু এলাকায় দেখা গেছে, অনেক বাতি বিকল হয়ে আছে। অনেক সড়কবাতির আলো এখন আগের মতো জ্বলে না। মাঝারি ধরনের আলো দিচ্ছে বাতিগুলো।

নিম্নমানের খুঁটি ও বাতি স্থাপনের পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে/ ঢাকা ট্রিবিউন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বিশ্বমানের ৩৬ ওয়াটের এলইডি বাতি স্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছিল কারিগরি কমিটি। সেই সুপারিশ অগ্রাহ্য করে সিটি মেয়র একক সিদ্ধান্তে ৩৬ ওয়াটের সঙ্গে ৬০ ওয়াট যুক্ত করে টেন্ডার আহ্বান করেন। সেই সঙ্গে কার্যাদেশ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালান।

কার্যাদেশ অনুযায়ী, গত বছরের জুন ও জুলাই মাসের মধ্যে শহরের প্রধান সড়কে এসব এলইডি বাতি লাগানো হয়। ইতোমধ্যে ৮০% খুঁটি স্থাপন ও বাতি লাগানোর কাজ শেষ হয়েছে। বাতি বিকল হয়ে যাওয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নানা প্রশ্ন তোলে কারিগরি কমিটি। কাকে লাভবান করার জন্য একক সিদ্ধান্তে মেয়র কার্যাদেশ দিয়েছেন সেটি নিয়েও প্রশ্ন এই কমিটির। তাদের প্রশ্ন, নিম্নমানের খুঁটি ও বাতি স্থাপনের পরও কীভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা দরকার।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে বাতি স্থাপনের জন্য ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। এতে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও মেয়র মোস্তাফিজার রহমান স্বাক্ষর করেন। পরে ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে জার্মানি অথবা ফ্রান্সের তৈরি ৩৬ ওয়াটের এলইডি বাতি স্থাপনের জন্য প্রকল্পের অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু ৩৬ ওয়াটের সঙ্গে ৬০ ওয়াটের বাতি সংযুক্ত করার জন্য একটি মহল উঠেপড়ে লাগে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজী শাহ আলম মেয়রের কাছে একটি চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্প অনুমোদনের ডিপিপিতে এলইডির দরপত্র অনুযায়ী ৩৬ ওয়াটের এলইডি বাতি কেনার কথা উল্লেখ থাকার পরও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত ডিপিপি অনুসরণ না করে ৩৬ ওয়াটের পরিবর্তে ৩৬/৬০ ওয়াটের বাতি অন্তর্ভুক্ত করে টেন্ডার আহ্বান করেন।

২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ৩৬ ওয়াটের পরিবর্তে ৩৬/৬০ ওয়াটের বাতি টেন্ডার শিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আপত্তি জানান। সেই সঙ্গে ডিপিপি অনুযায়ী টেন্ডার সংশোধন করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বানের সুপারিশ করেন। কারিগরি কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে সিটি মেয়র একক সিদ্ধান্তে ৩৬ ওয়াটের পরিবর্তে ৩৬/৬০ ওয়াটের বাতি লিখে টেন্ডার সংশোধনের নির্দেশ দেন। এভাবে টেন্ডার আহ্বানের আগেই পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত সিটি মেয়রের একক নির্দেশনা অনুযায়ী টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সেই সঙ্গে এডেক্স করপোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ থেকে ৫ ও ৭ এবং ৮ নম্বর প্যাকেজের কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী জার্মানি অথবা ফ্রান্সের তৈরি এলইডি বাতি সরবরাহ না করে চীনের নিম্নমানের বাতি স্থাপন করে। যেখানে জার্মানির তৈরি এলইডি বাতির মূল্য ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা সেখানে ১ হাজার টাকা মূল্যের চীনের তৈরি বাতি সরবরাহ করায় সড়কে আলোর স্বল্পতা দেখা দেয়।

এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের আপত্তির মুখে এসব সড়কবাতি পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পাঠানো হয়। সেখান থেকে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাতিগুলো জার্মানির নয় চীনের তৈরি। এসব বাতি নিম্নমানের। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা।

নিম্নমানের বাতি এবং খুঁটি দিয়ে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির বিষয়টি বিভিন্ন মহলে জানাজানি হলে গত ২৫ অক্টোবর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্সকে চিঠি দেন মেয়র। সেই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে এসব বাতি সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন।  গত ১০ জানুয়ারি সিটি মেয়র আবারও সাত দিনের মধ্যে সবগুলো সড়কবাতি অপসারণের আদেশ দেন। সিটি মেয়রের দুই দফা আদেশের সময় অতিবাহিত হলেও সড়কবাতি অপসারণ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উল্টো সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে ১৫ কোটি টাকার বিল নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন ঠিকাদার।

আট মাস না যেতেই অনেক সড়কবাতি বিকল হয়ে গেছে/ ঢাকা ট্রিবিউন

সিটি মেয়রের দুটি চিঠিতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সরবরাহকৃত এলইডি বাতিতে দেখা যায়, বাতির গায়ে কোনো ব্র্যান্ড, ভোল্টেজ, রেঞ্জ, ওয়াট, কান্ট্রি অব অরিজিন, লুমেন, লাইফটাইম সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই। এছাড়া বাতির “এসপিডি” (সার্স প্রটেকশন ডিভাইস)–এর গায়ে “মেড ইন চায়না” লেখা।

চিঠি প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্স করপোরেশন লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক জুবায়ের বিন রহমান বলেন, “সড়কে লাগানো বাতিগুলো জার্মানির। তবে বাতির ভেতরে যে, এসপিডি রয়েছে, সেটি আসলে চীনের তৈরি। তা থাকতেই পারে। তারা চাইলে আমরা চেঞ্জ করে দেবো। যেগুলো বিকল হয়ে গেছে সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হবে।”

প্রকল্প পরিচালক সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন বলেন, “এসপিডি ডিভাইস বাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি বজ্রপাত নিরোধক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এটি লাগানো হয়েছে চীনের তৈরি। এটি হতে হবে জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের।”

তিনি বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা বাতি দরপত্র বহির্ভূত। সে কারণে বাতি অপসারণ করতে বলা হয়েছে। আমরা দুই দফায় চিঠি দেওয়ার পরও কোনো পদক্ষেপ নেননি ঠিকাদার।”

এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডেক্সের এক কর্মকর্তা নাম না জানিয়ে বলেন, “পিডিবির ভোল্টেজ আপ-ডাউনের কারণে কিছু কিছু বাতি জ্বলছে না। যেসব বাতি বিকল হয়ে গেছে সেগুলো অপসারণ করা হবে।”

তবে পিডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রংপুরে এখন ভোল্টেজ আপ-ডাউনের কোনো সমস্যা নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। তাদেরকে সড়কবাতি সরানোর জন্য দুই দফায় আদেশ দিয়েছি।”

সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আযম বলেন, “সিটি মেয়র দুই দফায় চিঠি দিয়ে নিম্নমানের বাতি অপসারণ করতে বলেছেন। ওসব সড়কবাতি সরিয়ে আধুনিক সড়ক বাতি স্থাপনের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলেছি। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমাদের আদেশ পালন করছে না।”