মুন্সিগঞ্জে “ধর্ম অবমাননা”র অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ২০ দিন কারাগারে থাকার পর রবিবার (১০ এপ্রিল) মুক্তি পান তিনি।
এর আগে, গত ২০ মার্চ একটি ক্লাসে বিজ্ঞান পড়ানোর সময় ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। কয়েকজন শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে তার বক্তব্য রেকর্ড করে। পরবর্তীতে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হলে “আলোচনা-সমালোচনা” শুরু হয়। এরই প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ তাকে আটক করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সেদিন শ্রেণিকক্ষে কী ঘটেছিল, ঘটনার সূত্রপাত ও কারণ সম্পর্কে ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানিয়েছেন তিনি।
পাঠকদের সুবিধার্থে ঢাকা ট্রিবিউনের মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি শামীমা রীতাকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারটি হুবুহু তুলে ধরা হলো।
কেমন আছেন?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: ভালো আছি। বিশ্রামে আছি।
স্কুলে কবে যোগদান করছেন?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: এখন ঢাকায় আছি। চিকিৎসা নিয়ে ৪ থেকে ৫ দিন পর বাসায় ফিরবো, তারপর স্কুলে জয়েন করবো।
“ধর্ম অবমাননা”র বিষয়টি কিভাবে এলো?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: গত ২০মার্চ স্কুলে পরীক্ষা থাকায় শিক্ষক কম ছিলো। আর শিক্ষক কম থাকলে আমাকেই চালাতে হয়। আমি মূলত দশম শ্রেণির “খ শাখার” শ্রেণি শিক্ষক। শিক্ষক কম থাকলে দুটি শাখার শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নেই। সেদিন শিক্ষক কম থাকায় একই কাজ করি। ওই দিনও দশম শ্রেণির “ক শাখায়” দুটি ক্লাস একসঙ্গে করে বিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলাম। কিন্তু সেদিন যখন বিজ্ঞান বিষয় পড়ানো শুরু করি, আমি যতই বিজ্ঞানের কথা বলি একটা ছেলে ততই ধর্মের কথা টেনে আনছিলো। যতই এড়িয়ে যাচ্ছিলাম ততই ওরা প্রশ্ন করছিলো। ওরা যে আমরা কথা মোবাইলে রেকর্ড করছিলো তা আমি জানতাম না। আমি সরল মনে ক্লাস নিতে শুরু করি। একটা পর্যায়ে ওরা জিজ্ঞেস করতে শুরু করে ধর্ম আগে না বিজ্ঞান আগে, মানুষ কীভাবে এলো? ওরাই প্রশ্ন করে, আমি এড়িয়ে যাই। এরপর ওরা অভিযোগ দিলো, আমি ধর্ম অবমাননা করেছি।
২০মার্চ এ ঘটনার পর ২১মার্চও ক্লাস করালাম। স্কুল ছুটি হওয়ার পর বাসায় গেলাম। এ সময় হেডস্যার (প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দীন আহমেদ) ফোন দিয়ে বলল স্কুলে যাওয়ার জন্য। যাওয়ার পর স্যার বলল ছাত্ররা এ অভিযোগ দিয়েছে। আমি বললাম যা বলছি ছাত্ররা সব তার উল্টো বলছে। তারপর হেডস্যার বললেন তাহলে ২২মার্চ আপনি আসেন। আমরা সবাই মিলে একটা সমঝোতা করি। ২২ তারিখ সকাল ১১টার দিকে তারা বসলো, কিন্তু ছাত্ররা তখন আন্দোলন শুরু করে। তাদের চিৎকারের কারণে কিছু করতে পারলো না।
কারা ছিলো সেই আন্দোলনে?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের মধ্যে স্কুলের অষ্টম শ্রেণিরসহ ১০-১২ জন শিক্ষার্থী ছিলো ওই আন্দোলনে। কিন্তু তাদের নাম পরিচয় বলতে পারছি না। তবে বাকি সবাই বাইরের ছিলো। এদের অধিকাংশ বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় লোকজন। যখন পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে চলে যায়, তখন আক্রমণ শুরু করে আমাকে। হেডস্যার পুলিশ প্রশাসনকে ফোন দেয়। পুলিশ এসে আমাকে প্রটেকশন (নিরাপত্তা) দিয়ে সুন্দর মতো নিয়ে যায়। তারপর থানায় রাখে। তখন এসপি সাহেব ওইদিনের পুরো রেকর্ডটা শুনে আমাকে বলেন “স্যার এ রেকর্ডে আপনার ধর্মীয় অবমাননার তো কিছু নেই। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত, আপনাকে পুলিশ হেফাজতে থাকতে হবে।”
তখনই এসপি সাহেব, হেডস্যারের সাথে পরামর্শ করে মামলাটি হল। তবে মামলাটা যে এত কঠিন হবে তা বলা হয়নি। আমাকে বলা হল সহজ একটি মামলা দেবে। আমি দু’একদিনের মধ্যে জামিন নিয়ে বের হয়ে যাবো।”
কারা রেকর্ডটি করেছে?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: সেদিন ক্লাসে “ক শাখার” শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি ছিলো। কিন্তু ওদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ছে না। উপস্থিতি খাতা দেখলে বলতে পারবো।
শিক্ষার্থীদের আপনার ওপর মিথ্যা অভিযোগের কারণ কী?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: আসলে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টি আমার কাছে নতুন নয়। গত প্রায় ২০ বছর যাবৎ এখানে চাকরি। প্রায় প্রতিবছরই এমন নানা অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয় আমাকে। এর অন্যতম কারণ আমি ওই স্কুলের গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক। এটা গুরুত্বপূর্ণ এ জায়গাতেই আমি যেহেতু গণিত বিষয়টা দেখি। সেক্ষেত্রে টেস্টে যদি গণিতে পাস না করে তাহলে তো ওরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। স্কুলে এরকম ১০০ জনের মধ্যে এমন ১৪-১৫ জন ছাত্র থাকেই। বছরে দুই একবার আসে। ওরা এত লেখাপড়া করে না। ওরা খাতায় কেউ পায় শূন্য, কেউ পায় ৫। তাদের তো আর পাস করানো যায় না। তখনও এমন নানা রোষানলে পড়তে হতো। কিন্তু এবারের মতো এতো বেপরোয়া ছিলো না। তবে গত বছর করোনাভাইরাস মহামারিতে এমন কিছু ছিলো না। শুরু হয়েছে এ বছর থেকেই। এরসঙ্গে বাহিরের কিছু শিক্ষকও জড়িত আছে বলে আমি ধারণা করছি। যাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন আছে। তারা কোচিং সেন্টারে পড়ায়। কিন্তু আমার জন্য তাদের টিউশন থাকে না। এখন দেখা গেলো আমি ৫০-৬০জন ছাত্র পড়াই। তখন ওরা ছাত্র পায় না। তাছাড়া আমি কখনও ফাঁকি দেই না। তাই স্টুডেন্ট আমার কাছে বেশি পড়তে আসতো। এটা অনেকের পছন্দ হত না। শুধু বাইরে না স্কুলের ভেতরেও গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজির শিক্ষকরা বিষয়টা ভালোভাবে নিতো না। তবে আমি তাদের নাম বলতে চাইছি না।
আগে থেকেই শিক্ষার্থীরা আমাকে বিরক্ত করতো। আমার দরজায় লাথি দিতো। গালাগালি করতো। এ ঘটনার (২০মার্চ) আগে প্রায় ২০দিন আগে ৪টা ছেলে গেটে লাত্থি দিয়ে দৌড় দিলো। আমি দৌড় দিয়ে বের হয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু ধরতে পারিনি। প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন পরে ওই ৪টা ছেলেই আমার সামনে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে যাচ্ছিলো। শেষে আমি সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। কীরে আমাকে গালাগালি দিলি কেন?
ওরা অস্বীকার করল, বলল, “আপনি আমাদের স্যার, আপনাকে গালাগাল দিবো কেন? পরে ওদের স্থানীয় এক মুদি দোকানদারসহ কয়েকজন আটকিয়ে শাসিয়ে ছেড়ে দেয়। আর এর দুইদিন পর এ ঘটনা ঘটে।”
কারাগার থেকে বের হয়ে বলেছিলেন স্কুলের ভেতরের রেষারেষির কারণে আপনাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইছি।
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের পেছনে স্কুলের ভেতরের ও বাইরের শিক্ষকদের উসকানি রয়েছে। কারণ আমি কিছুটা কড়া ধাচের। সময়মতো স্কুলে না এলে, এলোমেলো, দৌড়াদৌড়ি করলে আমি বকাঝকা করি, শাসন করি। কিন্তু অন্য শিক্ষকরা তা করেন না। যার কারণে স্কুলটি এখন ধ্বংসের পথে। এখন আমি ভালো করতে গিয়ে ওদের রোষানলে পড়ে গেলাম। এখন এরা কারা তা আমি এখনও চিহ্নিত করতে পারছি না। স্কুলে গেলে বলতে পারবো।
এখানে আরেকটা বিষয় রয়েছে সেটা হলো, স্কুলটি দুই শিফটে। আমার সকালে ক্লাস শুরু হয় সাড়ে ১১টায়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আসে ১২টায়। একদিন জানতে পারি ওরা নাকি প্রাইভেট পড়ে মর্নিং শিফটের স্যারদের কাছে, তাই দেরি হয়। এখন আমি যেহেতু সময়মতো ক্লাসে ঢোকার ব্যাপারে জোর দেই, সেক্ষেত্রে ওই শিক্ষকের আমার প্রতি ক্ষোভ থাকতেই পারে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের পেছনে উসকানিদাতা হিসেবে তারা কাজ করছিলো। তা না হলে বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষার্থীরা কেন ধর্মের কথা নিয়ে আসবে আর রেকর্ডই বা কেন করবে। আর আন্দোলনে বাইরের ছেলেরাই বা কীভাবে এলো?
এ ঘটনার পেছনে যে শিক্ষকরা জড়িত তারা কারা?
হৃদয় চন্দ্র মন্ডল: এর মধ্যে কিছু স্কুলের ভেতরের শিক্ষক আছে আর কিছু বাইরের স্কুলের শিক্ষক আছে। এর মধ্যে গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকেরা আছে। তবে আমি তাদের নাম বলতে চাইছি না। কারণ যারা নোংরা, তারা নোংরাই থাকে। ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুক।
আমাকে প্রশাসন থেকে যথাযথ নিরাপত্তার মধ্য দিয়েই রেখেছে। কিন্তু আমি ও আমার পরিবার এখনও শঙ্কামুক্ত নই। তাই রাষ্ট্র ও সরকারের নিরাপত্তা চাইছি। আমি যাতে আমার পরিবার পরিজন নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারি। একইসঙ্গে আমি আমার স্কুলে নিরাপদে ক্লাস নিতে চাই।