চাষের উপযোগী হয়েও কাজে আসছে না চরের জমি

বাংলাদেশে চরের জমির মোট আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। যা রাজধানী ঢাকার আয়তনের তুলনায় আড়াই গুণ বড়। চরের এই জমির প্রায় ৯০%-ই চাষাবাদের উপযোগী।

তবে, কম উৎপাদন, আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাব, বাজারের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ কম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই চরের জমি থেকে তেমন কোনো লভ্যাংশ আসছে না।

বাংলাদেশের প্রধান চারটি নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের ৫০০টিরও বেশি উপনদী থেকে ধীরে ধীরে বালি, পলি এবং কাদামাটি জমার ফলে চরগুলো গঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন চরে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। কিন্তু চাষাবাদ সম্প্রসারণ পরিষেবার অভাব, বাজারের সঙ্গে সংযোগের সুযোগ কম হওয়া, অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব এবং আধুনিক খামার প্রযুক্তির কম গ্রহণের কারণে চরের কৃষকদের কম উৎপাদন এবং অল্প লাভে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পসময়ে উৎপন্ন ধানের জাত, উন্নত জাতের সবজি, তৈলবীজ বা অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষ করা হলে এবং কৃষকদের ন্যায্য বাজারমূল্য দেওয়া হলে চরের জমিতে চাষাবাদ ও ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিরি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি (কেএসইউ) বাংলাদেশের চরের জমি নিয়ে তিন বছরের একটি যৌথ কর্মসূচির ফলাফল প্রকাশ করেছে।

কেএসইউ মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) এক ওয়েবিনারে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চরের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো দরকার।

ওয়েবিনারে তারা কিছু প্রস্তাবিত নীতি সুপারিশসহ প্রকাশ করেছে।

২০১৯-২১ সালে রংপুর এবং পটুয়াখালী জেলার নির্বাচিত কয়েকটি চরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের চরভূমিগুলোতে জাতীয় গড় ২০০%-এর তুলনায় জমির চাষ যোগত্যা ১৪৫%। জমির চাষ যোগত্যা বলতে একটি কৃষি এলাকায় বছরে কতবার ফসল রোপণ করা হয় তাকে বোঝায়। এটি প্রকৃত ক্ষেত্রফলের সঙ্গে উৎপাদিত ফসলের অনুপাত।

চরের আবাদযোগ্য জমির ৭৬% ধান চাষের জন্য এবং বাকি অংশ অন্যান্য ফসল চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, কৃষকরা ধান চাষ করে যা উপার্জন করে তার চেয়ে তেলবীজ, চিনাবাদাম, আলু, মশলা এবং অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষ করে অনেক বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে।

ইরি, বিরি, বারি এবং কেএসই-এর গবেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশ যদি চরাঞ্চলের কৃষকদের স্বল্প সময়ের উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত সরবরাহ করতে পারে, তাহলে কৃষকরা আরও বেশি অর্থকরী ফসল চাষ করে বেশি আয় করতে পারবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখবে।

বাজার সংযোগ গড়ে তোলা ও খামার প্রযুক্তি সহজলভ্য করা

বাংলাদেশে ইরি’র কান্ট্রি হেড হুমনাথ ভান্ডারি জানান, বাংলাদেশের ছয়টি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিসম্পন্ন অঞ্চলগুলোর মধ্যে চর একটি। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর অধীনে বাজারের অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি চাষিদের কাছে কৃষি প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ায় এবং কার্যকরভাবে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে এমন প্রযুক্তির সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলেন।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী কয়েকজন বিজ্ঞানী ওয়েবিনারে তাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। যেখানে দেখা যায়, কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ (একবার ধান একবার অন্য ফসল) শস্য পরিকল্পনা কৃষকদের উপকার করতে পারে। 

এ সময় তারা উচ্চ ফলন, স্বল্প মেয়াদী এবং বন্যা সহনশীল ধানের জাত প্রবর্তন, রবি শস্য যেমন-আলু, চীনাবাদাম, সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজ, মিষ্টিকুমড়া, বাজরা, কালোজিরা এবং সহজ বাজার সংযোগ স্থাপনের সুপারিশ করেছেন।

ওয়েবিনারে কৃষি সচিব, সরকারি খামার গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তারাও অংশগ্রহণ করেন।

ওয়েবিনারে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রতি বছর ২০ লাখ হারে বাড়ছে, যেখানে আবাদি জমি কমছে ০.৪৫% হারে। যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও মূল ভূখণ্ডে শস্য উৎপাদনের সম্প্রসারণ সীমিত, তাই চরের জমিগুলো উপযুক্ত, উন্নত, এবং জলবায়ুর ঝুঁকি-প্রতিরোধী কৃষি প্রযুক্তি এবং অনুশীলনের মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চরভূমিতে অভিযোজিত শস্য পদ্ধতি বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন এবং খামারের আয় বৃদ্ধি করবে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে উন্নত ফসলের জাত এবং চরভূমিতে চাষাবাদে উপযোগী শস্যের ধরন পরীক্ষা ও চিহ্নিত করেছেন।

ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স (নাস) এবং ইউএসএআইডি-এর অর্থায়নে “বাংলাদেশের চরের গ্রামীণ পরিবারের জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন” শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।