মহাসড়ক এখন এক আতঙ্কের নাম। যানবাহনে ডাকাতি এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর অধিকাংশ ঘটনারই কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। যানবাহনে কয়েক ঘণ্টা ধরে ডাকাতি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও হাইওয়ে পুলিশের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে মধুপুর ঈগল পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার পর এখন গা শিউরে ওঠা বর্ণনা দিচ্ছেন আহতরা। শিশুদেরও রেহাই দেয়নি ডাকাতেরা। তারা যাত্রী বেশে কয়েক পর্যায়ে বাসে ওঠার পর ডাকাতি শুরুর আগে সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। ফলে যাত্রীরা ৯৯৯ নম্বরেও ফোন করতে পারেননি। তারা বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো গাড়ির গতিপথ পরিবর্তন করে তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাতি ও ধর্ষণ করে। কিন্তু এই সময়ে কোনো হাইওয়ে পুলিশ বা তাদের টহল গাড়ি ওই এলাকায় দেখা যায়নি। ডাকাত দল ডাকাতি শেষে মাইক্রোবাসে করে পালিয়ে যায়। হাইওয়ে পুলিশের দাবি, তারা ওই সময় অন্য একটি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
গত ১৩ বছরে ওই এলাকায় চলন্ত বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডাকাতির সময় দুই নারীকে হত্যা ও চারজনকে ধর্ষণের রেকর্ড আছে পুলিশের কাছে। ২০০৯ সালে বাস ডাকাতরা টাঙ্গাইলের মহাসড়কে ডাকাতি করতে গিয়ে বাসন্তী মাংসাং নামে এক স্কুল শিক্ষিকাকে হত্যা করে। ২০১৬ সালে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি এলাকায় “বিনিময় পরিবহনে” বাস ডাকাতেরা এক নারীকে ধর্ষণ করে। ২০১৭ সালে ওই মহাসড়কেই বাসে জাকিয়া সুলতানা রূপা নামে এক যাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ওই মহাসড়কের বাসে আরও তিনজন নারী বিভিন্ন সময় বাস ডাকাতদের ধর্ষণের শিকার হন।
বাস ডাকাতরা বেপরোয়া
গত ১১ জুন ঢাকার আশুলিয়া এলাকা থেকে বাসে ডাকাতির প্রস্তুতির নেওয়ার সময় সংঘবদ্ধ একটি চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। তারা ১১ মে আশুলিয়ায় হানিফ পরিবহন, ২৫ মে রাজশাহীতে ন্যাশনাল ট্রাভেলস এবং ২৯ মে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানিতে স্টার লাইন পরিবহনে ডাকাতিতে জড়িত। শুধু তাই নয়, গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারা গত দেড় বছরে অন্তত মহাসড়কে ১৫টি ডাকাতি করেছে।
ডাকাত দল আরও জানিয়েছে, তারা চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কে সৌদিয়া বাসে ডাকাতির সময় বাসচালকের হাতে ও সহকারীর পেটে ছুরিকাঘাত করে। এছাড়া তারা ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ফাল্গুনি ট্রাভেলস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও কনক পরিবহন, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে সুরভী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, সিলেট-রাজশাহী মহাসড়কে শ্যামলী পরিবহন ও রইস পরিবহন, ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে পাবনা এক্সপ্রেস ও সরকার ট্রাভেলস, রাজশাহী-বরিশাল মহাসড়কে সেবা গ্রীণলাইন ও তুহিন পরিবহনে ডাকাতি করেছে বিভিন্ন সময়ে। এই চক্রটি কমপক্ষে ১৫ বছর ধরে মহাসড়কে ডাকাতি করে আসছে। এই ডাকাতির সময় তারা একাধিক ধর্ষণের কথাও স্বীকার করেছে।
প্রতিদিন তিনটি কল
হাইওয়ে পুলিশের কাছে মহাসড়কে ডাকাতির কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে মহাসড়কে বাস ডাকাতির বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায়, গত সাত মাসে অন্তত ২৫টি বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বাসে। আর গত তিন মাসে জাতীয় জরুরি সহায়তা নম্বর ৯৯৯-এ যানবাহনে ডাকাতিসহ নানা অঘটনের ঘটনায় কল এসেছে ২৪৮টি। গড়ে প্রতিদিন এই সংক্রান্ত কল আসে তিনটি।
সারাদেশে হাইওয়ে আছে ১১ হাজার ৮০৬ কিলোমিটার। ২০০৫ সাল থেকে মহাসড়কের নিরাপত্তায় কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ। তাদের মোট জনবল আছে দুই হাজার ১৯২ জন। পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ হয়ে কাজ করে তারা। প্রতিটি অঞ্চলের দায়িত্বে একজন করে পুলিশ সুপার।
ডাকাতির ঘটনা নিয়ে জানার জন্য চেষ্টা করেও হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মিজানুর রহমানকে পাওয়া গেলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
তবে হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, “আমাদের পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় অনেক জায়গায় টহল দেওয়া সম্ভব হয় না।”
যাত্রীর সাজে ডাকাত
এদিকে বাসে ডাকাতির ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডাকাত দল সড়কের মাঝখান থেকে যাত্রী সেজে বাসে ওঠে। মধুপুরে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় দেখা গেছে ডাকাত দল তিন জায়গা থেকে যাত্রী হিসেবে ওঠে। কিন্তু দূরপাল্লার বাসে মাঝপথে যাত্রী ওঠানো নিষেধ। চালক ও শ্রমিকরা বাড়তি আয়ের জন্য এই কাজটি করেন। যার পরিণতি হয় ভয়াবহ। আবার দুই-একটি ঘটনায় বাসের চালক সুপারভাইজারদের সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পাওয়া গেছে তদন্তে।
দূরপাল্লার বাসে যাত্রীদের সবার ছবি ও ভিডিও যাত্রার শুরুতে তুলে রাখার নিয়ম থাকলেও তা এখন মানা হচ্ছে না। পুলিশেরও এই দায়িত্ব আছে। তারা যেকোনো জায়গায় বাস থামিয়ে অন্তত একবার ছবি তুলবে ও ভিডিও করবে। কিন্তু মধুপুরের ঈগল পরিবহনের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। আর শুরুতে ছবি তোলা হলেও মাঝপথে যাত্রী তুললে তাদের ছবি থাকে না। ডাকাতেরা এই সুযোগ কাজে লাগায়।
হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তারা সড়কে টহলের সময় তাদের নজর থাকে পণ্যবাহী ট্রাকের দিকে। বাসের দিকে তাদের কোনো নজর থাকে না। ফলে ডাকাতির সময় হাইওয়ে পুলিশকে পাওয়া যায় না। মধুপুরে তিন ঘণ্টা ধরে বাসে ডাকাতি হলেও কোনো হাইওয়ে পুলিশকে ওই এলাকায় টহলে দেখা যায়নি। এমনকি পরবর্তীতেও তাদের কোনো তৎপরতা ছিল না। যা করার স্থানীয় থানা পুলিশ করেছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্ল্যাহ চালক ও সুপারভাইজারদের লোভের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ থাকার পরও তারা মাঝপথে যাত্রী তোলেন। আর অধিকাংশ ঘটনায়ই মাঝপথ থেকেই যাত্রীবেশে ডাকাত ওঠে। নিয়ম থাকলেও ছবি ও ভিডিও নেওয়া হয় না। পুলিশও এটা এখন আর করে না।”
তিনি বলেন, “মহাসড়কে ২০-২৫টি জায়গা আছে যেখানে নিয়মিত ডাকাতি হয়। ওইসব এলাকায় নিয়মিতভাবে হাইওয়ে পুলিশ টহল দিলেই ডাকাতি বন্ধ হবে। আমরা অনেক দিন ধরেই এটা বলে আসছি। হাইওয়ে পুলিশ ট্রাকের দিকেই বেশি নজর দেয় লাভের আশায়।”
হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নজমুস সাকিব খান দাবি করেন, “বাসের ভেতরের লাইট বন্ধ থাকলে আমরা কিছু বুঝতে পারি না। আর অস্বাভাবিক কিছু না দেখলে আমরা গাড়ি থামাই না। বাইরে থেকে তো আর বোঝা যায় না।”
তিনি হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির দিকে মনোযোগের অভিযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, “আমরাও অভিযোগ পাই। কিন্তু প্রমাণ না পেলে তো ব্যবস্থা নিতে পারি না।”
তিনি দাবি করেন, মধুপুরে ঈগল পরিবহনের ডাকাতির কাছেই এলেঙ্গা এলাকায় টহল ছিল। তবে তারা একটি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।