রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই বর্ষামৌসুমে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বুধবার (১৭ মে) সকালে মাত্র আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর সড়কে পানি জমে যায়। সহসাই যে জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে রাজধানীবাসী মুক্তি পাচ্ছে না, তা যেন আবারও প্রমাণিত হলো।
জলাবদ্ধতার সমস্যায় নাকাল সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতেই যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ কতটুকু প্রস্তুত?
বুধবারের বৃষ্টির পানিতে পান্থপথ, শুক্রাবাদ, নিউমার্কেট, হোসেনী দালান রোড, পুরান ঢাকার মতো এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। হোসেনী দালান রোড এলাকার শিশির হক ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও এখানে পানি জমে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার “উন্নত ঢাকার উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ৩ বছর” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দাবি করেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৬টি জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন হয়েছে। ফলে ঢাকা শহর আর অল্প বৃষ্টিতে ডোবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ডিএসসিসির আওতাধীন শ্যামপুর, মান্দা, জিরানী ও কালুনগর- এ চারটি খাল থেকে বর্জ্য ও পলি অপসারণ করে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৮৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এ চারটি খালের নকশা, অঙ্কন ও জরিপের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে এসব খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ ও ভূমি উন্নয়নের লক্ষ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ থেকে রায়েরবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত মূল বুড়িগঙ্গা খালটি প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। ম্যাটাডোর বলপেন, পান্না ব্যাটারির মতো অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে এটি খুব সংকীর্ণ একটি খালে পরিণত হয়েছে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ছাড়াও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও ঢাকা জেলা প্রশাসনসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের আন্তরিক সহযোগিতায় আমড়া খালের পুনঃসীমান্তকরণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব অর্থায়নে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে খালের বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া, ডিপিপি প্রণয়নের জন্য পরামর্শক নিয়োগের পাশাপাশি খালের মাটি পরীক্ষা ও জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলেছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিজানুর রহমান ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
অন্যদিকে, বুধবার সকালে কয়েক মিনিটের বৃষ্টির পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায়, আনন্দ সিনেমা হলের সামনের রাস্তার দুই পাশে পানি জমে আছে।
এখানকার দোকানদার শাহীন মিয়া বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই এই সড়কে পানি জমে যায়। বৃষ্টির সময় এ রাস্তায় যাতায়াত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।”
এছাড়া, বুধবারের বৃষ্টিতে উত্তর বাড্ডা এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। ওই এলাকার বাসিন্দা মারুফ বলেন, “আমার শৈশব কেটেছে উত্তর বাড্ডা পূর্বাচল রোডে। বৃষ্টির পর এখানে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে। কিন্তু আমার বাড়ির ৫০০ গজের মধ্যে স্থানীয় কাউন্সিলরের নিজের বাড়ি।”
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ১০৩টি স্থানে এ ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার অবস্থা খুবই খারাপ। নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় অল্পতেই পানি জমে যাচ্ছে। অধিকাংশ রাস্তাই মানুষ ও যানবাহনের চলাচলের অনুপযোগী।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন খাল দখল করে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে “ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ২৯টি খাল ও একটি পুকুরের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের পর সীমানা পিলার স্থাপন, খাল ও পুকুরের জিআইএস ডাটাবেস তৈরি” শীর্ষক প্রকল্প চলমান রয়েছে। বর্তমানে কল্যাণপুর রেগুলেটরি পুকুর থেকে কাদা অপসারণের কাজ চলছে। ঢাকায় ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা মোকাবিলায় একটি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হয়েছে।
আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে উভয় পাশের ড্রেন পুনর্নির্মাণ করে বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণ সংক্রান্ত গত ১ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রয়োজনীয় নকশা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। একইসঙ্গে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনে আব্দুল্লাহপুর টঙ্গী ব্রিজ থেকে বনানী লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত কাজের নকশা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এই নকশা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এছাড়া বিমানবন্দর সড়কের উভয় পাশের ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে ৮ ফুট ব্যবধানে এফআরবি ম্যানহোল কভার স্থাপন এবং আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য বিআরটি ও বিবিএ প্রকল্পের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি ও প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সেলিম রেজার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এখানে আসলে কোনো পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগে ড্রেনেজ সার্কেলের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক), ড্রেনেজ সার্কেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল আলমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।