২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিকল্প পাওয়ার হাউস হিসেবে খ্যাত "হাওয়া ভবন" ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের দায়মুক্তিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বলে বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তার বয়ান এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মিডিয়ায় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পরবর্তী সরকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তারেক রহমান ও তার সহযোগীসহ বিএনপির অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগে বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয় এবং বিএনপি আমলে সংঘটিত সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাপক মাত্রায় ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির তথ্য প্রকাশ করে।
বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে তাদের দুনীর্তির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মূলধারার গণমাধ্যমের অসংখ্য সাংবাদিক সরকারি বাহিনী, সন্ত্রাসী ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের দ্বারা আক্রমণ ও হয়রানির শিকার হন।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা সম্প্রতি দাবি করেছেন, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার “হাওয়া ভবন”-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতার সব অভিযোগ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। তাদের দাবি, তারেক রহমান নির্দোষ এবং “হাওয়া ভবন”কে ঘিরে দুর্নীতির তথ্য মিডিয়ার সৃষ্টি।
বিএনপি নেতাদের দাবি, রাজধানীর বনানী ১৩ নম্বর রোডে অবস্থিত “হাওয়া ভবন” নামের ভবনটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল।
২০০৫ সালে বাংলাদেশকে টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত "দুর্নীতি ডেটাবেস ২০০৫" তৎকালীন সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। সেই সময়ে শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে (পুলিশ) দুর্নীতির সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে ভয় দেখানোর জন্য মিডিয়া এবং সংসদকে ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।
বিএনপি সরকারের ওই মেয়াদকালে সরকারি দুর্নীতিকে দায়ী করে বিশ্বব্যাংক তাদের তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পের তহবিল বাতিল করে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী "হাওয়া ভবন"কে "উইন্ড টানেল" হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০০৫ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাপকালে তারেক রহমানকে "অপরিশীলিত এবং বিপজ্জনক" বলে উল্লেখ করেন তিনি। সেই সময়ে তিনি উল্লেখ করেন, নিজের অনভিজ্ঞতার কারণে তারেক রহমান হাওয়া ভবনে কিছু অসাধু বন্ধুদের সহযোগিতা নিতেন।
২০০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের চ্যার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জুডিথ এ চাম্মাস তারেক রহমানকে "ডার্ক প্রিন্স” বলে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “হওয়া ভবন” ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক পদ প্রাথীদের কাছ থেকে নগদ অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, তারেক রহমান মানুষের মধ্যে ভয়ভীতির সঞ্চার করেন। তার এই ভীতি সঞ্চার প্রক্রিয়ার শিকার বিএনপির কম প্রভাবশালী নেতাকর্মীসহ, স্ব-আরোপিত সেন্সরিংয়ে থাকা সাংবাদিক, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তারা। ভুক্তভোগীদের মতে তারেক ছিলেন নির্মম, অনভিজ্ঞ ও বাস্তব জ্ঞানহীন।
হাওয়া ভবন/সংগৃহীতনির্বাচন ও মন্ত্রিসভা
২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারেকে রহমানের নির্দেশনায় বিএনপি পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং যেকোনো উপায়ে জয় নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে ওই বছরের ২০ জুন ঢাকা থেকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক বার্তায় উল্লেখ করা হয়।
তারেক রহমান এবং তার "হাওয়া ভবন কৌশলগতভাবে নির্বাচনী এলাকার রাজনীতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দেশব্যাপী প্রচারণার পরিকল্পনা করে বলে ২০০৬ সালের ৪ ডিসেম্বর একজন মার্কিন কর্মকর্তা অবহিত করেন।
এর আগে তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন এবং ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়া, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতি পদের বিনিময়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে বিএনপি জোটে যোগ দিতে রাজি করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা।
খালেদা জিয়া আশা করেছিলেন যে, তার জোট অষ্টম জাতীয় সংসদে ২২০টি আসন পেলেও পরবর্তী নির্বাচনে ১৮০-১৯০টি আসনে জিতে ক্ষমতায় আসবে। জেনারেল এরশাদ তাকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও তিনি ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিসকে জানান।
২০০৬ সালের ২ নভেম্বর ওয়াশিংটনে লেখা এক চিঠিতে প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস উল্লেখ করেন যে, খালেদা জিয়া দাবি করেছেন তার দলের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি তাদের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকটি নাম জমা দিয়েছে।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর দলে তারেক রহমানের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য নতুন প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে উদ্দীপনা জাগালেও পুরোনোদের মধ্যে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ান। অনেক নেতা তাকে খালেদা জিয়ার পর দলীয় প্রধান হিসেবে তারেককে দেখার বিরোধিতা করলেও তাদের মত প্রকাশে সাহস পাননি। ২০০৪-০৫ সালে দেশব্যাপী তার সফর যুবকদের মধ্যে উদ্দীপনা জাগিয়েছিল এবং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রতিনিধি বাছাইয়ে তাকে সাহায্য করেছিল।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস বলেন, "২০০২ সালের পর থেকে হঠাৎ করে মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর পোর্টফোলিও বিক্রি করে সিনিয়র নেতাদের একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন যারা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করেছিলেন।”
তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তার কাছে পোর্টফোলিও বাণিজ্য থেকে তারেক কীভাবে লাভবান হয়েছেন তা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, "প্রথম দিকে মন্ত্রিসভায় মাত্র ২৯ জন সদস্য থাকার কথা ছিল, কিন্তু তারেক এবং তার কিছু সহযোগী এটি শোনার পর তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে সেখানে নতুন মন্ত্রীদের জন্য খুব কম বা কোনো জায়গা থাকবে না। তাই, তারেক বর্ধিত মন্ত্রিসভা এবং জুনিয়র মন্ত্রীদের প্রতি জন্য জোর দিয়েছিলেন"
অবশেষে, মন্ত্রী পরিষদের আকার ৬০ সদস্যে উন্নীত হয়। এর মাধ্যমে তারেক এবং তার সহযোগীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ে বলে ২০০৬ সালের ২৩ এপ্রিল মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তাকে বলেছিলেন ওসমান ফারুক।
যেভাবে টাকার পাহাড় গড়েছিলেন তারেক রহমান
মার্কিন দূতাবাসের আরেকটি সূত্র বলছে, তারেক রহমান কোটি কোটি ডলারের অবৈধ সম্পদ সংগ্রহ করেছেন। অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে।
তারেক রহমান ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার কোটি কোটি ডলার চুরি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুন্ন করেছে বলে উল্লেখ করে দূতাবাস।
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির মতে, তারেকের দুর্নীতির উদাহরণ শুধু মোনেম কনস্ট্রাকশনের মতো স্থানীয় কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোনেম কনস্ট্রাকশন তারেক রহমানকে সাড়ে চার লাখ মার্কিন ডলার উৎকোচ দিয়েছিল।
সিমেন্স থেকে তারেক এবং তার ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে ঘুষ নিয়েছেন উল্লেখ করে একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী জানান, “অন্ধকারের রাজকুমার” বাংলাদেশে সিমেন্সের সমস্ত চুক্তি থেকে প্রায় ২% কমিশন নিয়েছিলেন।
টঙ্গীতে একটি ৮০ মেগাওয়াট প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য চীনা কোম্পানি হারবিন তারেক রহমানকে সাড়ে সাত লাখ মার্কিন ডলার উৎকোচ দিয়েছিল। মরিয়ার্টি জানান, তারেকের সহযোগীদের একজন এই ঘুষের টাকা সিটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য সিঙ্গাপুরে যান।
সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আনোয়ারুল কবির চৌধুরী জানান, হারবিন কোম্পানির সঙ্গে বেশ কিছু জ্বালানি চুক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। তারেক রহমান এবং তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেনের বেশকিছু দুর্নীতির তথ্য উন্মোচনের কারণে ২০০৬ সালের ৩ অক্টোবর তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলে মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তাকে জানান আনোয়ারুল কবির চৌধুরী।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন সচিব খন্দকার শহিদুল ইসলামকে এসব অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানাতে বলেছিলেন।কিন্তু "দুর্ভাগ্যবশত, খন্দকার শহিদুল ইসলাম হারবিনকে সমর্থনকারী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনিই তারেক রহমানকে এই অভিযোগের বিষয়ে সতর্ক করেন।
আনোয়ারুল কবির চৌধুরী দাবি করেন, তাকে বরখাস্ত করার ইস্যু তৈরির জন্য লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে ঢাকার আশপাশের বিদ্যুৎ অফিসে জনতার হামলার প্ররোচনা দেন তারেক রহমান।
তিনি জানান, সেই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি মূলত অকেজো ছিল, ২০০৫ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার পর এক বছরে এটিতে ৭৫ বারের বেশি বিঘ্ন ঘটে।
বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের ছেলে শাফিয়াত সোবহান সানভীরের বিরুদ্ধে হওয়া একটি হত্যা মামলার বিচার প্রভাবিত করতে তারেক রহমান ২ কোটি ১০ লাখ নিয়েছেলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে মরিয়ার্টি বলেন, সানভিরকে সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক এই অর্থ দাবি করেছিলেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ফান্ডের অ্যাকাউন্ট থেকেও ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তারেক রহমান। তিনি তার নিজ শহর বগুড়ায় একটি জমি কেনার জন্য ট্রাস্টের তহবিল ব্যবহার করেছিলেন এবং ২০০৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য অবৈধভাবে অর্থ ব্যয় করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।