ঋতুস্রাবে ন্যাকড়া নয় প্যাড, ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন ‘প্যাড আপা’

বন্যাপ্রবণ গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী পাখি আক্তার। কিছুদিন আগেই তার খালার জরায়ু ক্যান্সারের কথা জানতে পেরেছেন। পাখির বড় বোনের বিয়ে হয় ১৪ বছর বয়সে। গত তিন মাস ধরে জননাঙ্গে জ্বালাপোড়া ও চুলকানিতে ভুগছেন সেই বোনও।

গত পাঁচ মাস ধরে যোনীর প্রদাহে ভুগছেন পাখি নিজেও।

দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের কারণে বন্যাকবলিত গাইবান্ধার ফুলছড়ি ইউনিয়নের শত শত নারী যোনিপথে জ্বালাপোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ভুগলেও বলতে অস্বস্তি

দেশে নারীরা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নানাভাবে বিড়ম্বনার শিকার। স্বাভাবিক নিয়মে মাসিক হলেও সেটি নিয়ে কথা বলাটা এখনও আড়ালের বিষয়।

পিরিয়ড বা মাসিক স্বাভাবিক ও একজন নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যক্তিগত এই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করলে তা সহজেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতি বছরের ২৮ মে বিশ্বব্যাপী মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস পালন করা হয়। তবে বিরূপ সামাজিক পরিবেশের কারণে বেশিরভাগ নারী তাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন না।

২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর ৬,৫০০ জনের বেশি নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মারা যান। 

দেখা যায়, এই রোগে আক্রান্ত ৯৮% নারী যোনির পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

পাখিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা কখনও চিকিৎসার জন্য কোনো হাসপাতালে গিয়েছিলেন কি-না?

এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, স্থানীয় ক্লিনিকে শুধুমাত্র একজন পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকায় তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।

“আমার বোনের যোনির জ্বালাপোড়া আরও বেড়েছে। চুলকানি ও ফুসকুড়ি (র‍্যাশ) কারণে তার যোনি ফুলে গেছে।”

গ্রামের নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতন করছেন প্যাড আপা/ ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, “সব কাজ শেষ করে আমার বোন কিছু সময়ই শুধু ফ্যানের কাছে বসতে পারে। তাও যদি বাড়ির লোকজন না থাকে তাহলে। এটা করলে তার কিছুটা ব্যথা উপশম হয়।”

পাখি বলেন, “তার বোন বা তার পরিবারের কোনো নারী তাদের স্বামী বা বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে নিয়ে কথা বলতে পারে না।”

এগিয়ে এসেছেন প্যাড আপা

গাইবান্ধার মোল্লারচর ও ফুলছড়ি ইউনিয়নের দরিদ্র নারীদের কাছে প্যাড ও স্বাস্থ্যবিধি পণ্য বিক্রি করেন সেলিমা আক্তার। নারী স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করায় তাকে স্থানীয়রা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন “প্যাড আপা”।

৪০ বছর বয়সী এই নারী হাসিমুখেই নিজের এই নামটি বললেন।

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “তারা আমাকে একজন স্বাস্থ্যকর্মী মনে করেন। একদিন পাখি এসে আমাকে তার এবং তার বোনের সমস্যার কথা বললো। আমি তাদের মাসিকের সময় ন্যাকড়ার পরিবর্তে প্যাড ব্যবহার করার পরামর্শ দিলাম।”

তিনি আরও বলেন, “সামাজিকভাবে এই বিষয়টা অনেকটা নিষিদ্ধ অবস্থার মতো হওয়ার কারণে জেলা ও অন্যান্য এলাকার নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় তাদের ব্যবহৃত ন্যাকড়া বাইরে শুকাতেও দিতে পারে না।”

সেলিমা বলেন, “ন্যাকড়া ভালোভাবে না শুকানোয় এটি র‍্যাশ তৈরি করে। এতে গোপনাঙ্গে জ্বালা হয়। তারা কাপড় বা ন্যাকড়া থেকে রক্ত সরাতে ছাই ও পানি ব্যবহার করে, যা ক্ষতিকর।”

এছাড়া এলাকার অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ফলে ১০ টাকা দামের প্যাডও বিলাসিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নারী

গাইবান্ধা জেলায় গত তিন বছর ধরে নারীদের সেবা করে আসছেন সেলিমা। মাসিক-পরবর্তী বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পর অন্যদের সাহায্যে এ উদ্যোগ নেন তিনি।

বিয়ের পর একটি আঘাতে তার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে নিজের পরিবারে বারবার অবজ্ঞার শিকার হন এই নারী।

প্যাড বিতরণ করছেন সেলিমা আক্তার/ ঢাকা ট্রিবিউন

২০১৮ সালে নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ গাইবান্ধায় কিছু নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিলে এই কাজে তারও যাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিনে তিনি ১০টি স্যানিটারি প্যাড বা ন্যাপকিন ও মাসিকের সময় পরিচ্ছন্ন থাকার কিছু সামগ্রী কিনে নেন।

ঢাকা ট্রিবিউনকে এই নারী জানান, কুসংস্কার ভেঙে ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ও পুরুষদের মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবহিত করতে ও প্রয়োজনীয় সেবা দিতে তিনি কাজ করতে পারবেন এমনটা কখনই ভাবেননি।

মাসিকের সময় কোন পণ্য ব্যবহার করবেন নারীরা?

দুই ইউনিয়নের প্রায় ৪০ জন নারী ও কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা ট্রিবিউন। এতে দেখা যায়, বেশিরভাগ নারীই কীভাবে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করতে হয় সেটি জানেন না।

তারা বলছেন, পিরিয়ডের সময় ন্যাকড়া বা কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করেন তারা। আর সেটি আবারও ব্যবহারের জন্য দূষিত বন্যার পানিতে ধুয়ে ফেলেন।

বছরের পর বছর ধরে এভাবেই নারী স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে আসছেন তারা।

২০১৮ সালে ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে অনুযায়ী, ৭১% নারী একবার ব্যবহারের ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। আর ৮৬% নারী পুরানো কাপড় ও ন্যাকড়া ব্যবহার করেন।

নারীরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হলো জামাকাপড় এবং ন্যাকড়া বাড়িতে সহজেই পাওয়া যায় এবং কোনো খরচ হয় না। 

একটি নিম্নআয়ের সম্প্রদায়ের নারীরা জানান, ঋতুস্রাবের সময় পাটের বস্তা ব্যবহার করেন তারা। সেটি পরিষ্কার করেন বালি দিয়ে।

সমতা প্রকল্প, অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি) ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের অর্থায়নে সিটিজেন ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকশন (সিভিএ) তৈরি করেছে। 

তারা পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতন করতে কাজ করছেন।

সমতা প্রকল্পের ব্যবস্থাপক প্রশান্ত রঞ্জন শর্মা রায় বলেন, আমাদের লক্ষ্য নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন করা।

তারা বলছেন, জরায়ু ক্যান্সার ও যোনিতে জ্বালাপোড়ার বিরুদ্ধে সতর্কতার অংশ হিসেবে এসব এলাকার ৫৪% নারী এখন মাসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।