মাধ্যমিকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদারক ও মূল্যায়ন বিভাগের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
যেখানে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এই দুটি বিষয়ে খুবই দুর্বল।
শিক্ষাবিদরা এই দুর্বলতার পিছনে প্রধান কারণ হিসাবে যোগ্য শিক্ষকের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সিলেট বিভাগ প্রায় সব বিষয়েই দক্ষতা অর্জনের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তবে একাডেমিক কৃতিত্বের দিক থেকে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সকল পরিমাপে সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। যেখানে শহুরে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শ্রেণিতে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় এগিয়ে রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদারক ও মূল্যায়ন বিভাগ ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস (এনএএসএস) ও লার্নিং এসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি ইন্সটিটিউশন (এলএসআই)-২০১৭ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সারাদেশে ষষ্ঠ শ্রেণির ২৮,১৯৪ জন, অষ্টম শ্রেণির ২৭,৭৩৭ জন এবং দশম শ্রেণির ২৭,২৮৪ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিল।
প্রতিবেদন তৈরিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, বাড়ির কাজে ব্যয় করা সময় ও অভিভাবকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ডিএসএইচই সেক্রেটারি সোলেমান খান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রতিবেদনের ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও শেখার ফলাফল উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে যাতে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারে।”
মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক আমির হোসেন বলেন, “ব্যান্ড স্কোর-৬ নম্বরের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের শেখা ও দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।”
ব্যান্ড ৬-কে সবচেয়ে উন্নত (এগিয়ে) হিসাবে রেট দেওয়া হয়েছে এবং ব্যান্ড ২-এর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা স্কোর (পিছিয়ে) রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ষষ্ঠ শ্রেণির মাত্র ৫.১% শিক্ষার্থী শেখার ও দক্ষতায় ভাল স্কোর করেছে, অর্থাৎ গণিতে ব্যান্ড ৬ অর্জন করেছে।
এছাড়া সাত ও দশ গ্রেডের ছাত্ররা যারা ব্যান্ডে স্থান পেয়েছে তারা যথাক্রমে ১৪.৫% ও ২৮.৪% স্কোর করেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিতে দক্ষতার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ।
এদিকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ এবং সবচেয়ে পিছিয়ে আছে সিলেটের শিক্ষার্থীরা।
তবে অষ্টম শ্রেণিতে রাজশাহীর পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।
দশম শ্রেণিতে গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় খুলনা বিভাগ শীর্ষে থাকলেও রাজশাহী বিভাগ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সিলেটের শিক্ষার্থীরাও উভয় গ্রেডেই সবচেয়ে পিছিয়ে।
দক্ষতার দিক থেকে মেয়েরা দশম শ্রেণিতে গণিতে এগিয়ে। তবে ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে ছেলেরা এগিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইংরেজির মূল্যায়ন
ইংরেজির ক্ষেত্রে, মাত্র ৯.৩% শিক্ষার্থী ৬ গ্রেডে ৬ এর ব্যান্ড স্কোর অর্জন করেছে।
এদিকে, অষ্টম ও দশম শ্রেণিতে যথাক্রমে ২৬.৪% ও ৪০.৪% শিক্ষার্থী এই ব্যান্ড পেয়েছে।
এছাড়াও, ২৯.১% ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র সর্বনিম্ন ব্যান্ড স্কোর ২ পেয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণীতে ইংরেজিতে দক্ষতার দিক থেকে রাজশাহী বিভাগ এগিয়ে রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ স্কোরের সাথে সিলেট বিভাগ পিছিয়ে রয়েছে।
অষ্টম শ্রেণিতেও একই চিত্র পাওয়া গেলেও দশম শ্রেণির পরিস্থিতি ভিন্ন।
এই শ্রেণীতে, ঢাকা বিভাগ ইংরেজিতে দক্ষতার দিক থেকে এগিয়ে, রাজশাহী বিভাগ ও ময়মনসিংহ সবচেয়ে খারাপ স্কোর করেছে।
তবে, প্রতিবেদনে বাংলা ভাষায় দক্ষতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ভালো চিত্র পাওয়া গেছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির প্রায় ২৫.৮% শিক্ষার্থী বাংলায় ৬ এর ভালো মানের ব্যান্ড স্কোর করেছে। এদিকে, অষ্টম এবং দশম শ্রেণীতে, রেটিং স্কোর যথাক্রমে ৪৭.৭% ও ৬৪.৩%।
ষষ্ঠ, অষ্টম ও দশম শ্রেণীতে সর্বনিম্ন ব্যান্ড স্কোর ২ পাওয়া শিক্ষার্থীদের শতাংশ যথাক্রমে ৬.৬%, ১.৫% ও ০.৪%।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “যেসব শিক্ষকের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি নেই তারা বিষয়টা নিখুঁতভাবে পড়াতে পারেন না ও শিক্ষার্থীরা কাঙ্খিত শিক্ষার ফলাফল অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে পারেন না।”
“এই ঘটনাটি শুধুমাত্র ইংরেজি এবং গণিতের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য বিষয়ের জন্যও সত্য,” তিনি যোগ করেন।
এছাড়া সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে ও মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়ার জন্য জন্য ব্যাপক ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিবর্তনের গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।