বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের পরীক্ষার্থীরা। গত ১ সেপ্টেম্বর গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্টের ১১০টি পদে প্রায় ৩৩ হাজার প্রার্থী অংশ নেন। তবে সব কেন্দ্রেই প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা শুরুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে ঘোষণা দিয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে পরীক্ষা নেওয়াকে প্রশ্ন ফাঁসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।
একাধিক পরীক্ষার্থী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, পরীক্ষার আগে বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছেন বলে জানাজানি হলে তারা সব কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক বাড্ডা আলাতুন্নেসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ (সেক্টর-৭), এবং উত্তরন গার্লস হাই অ্যান্ড কলেজসহ (সেক্টর-৬) অন্তত তিনটি কেন্দ্রে যান।
পরীক্ষা স্থগিত করার দাবিতে তিনটি কেন্দ্রেই পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
বিক্ষোভের জেরে উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেন পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও বিমানের প্রশাসনিক পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান। ওই পরীক্ষা কেন্দ্রে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বদরুল হাসান, বিমানবন্দর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিমান ও সিএ) সাঈদ কুতুব উপস্থিত ছিলেন।
এডিসি বদরুল হাসান ও এডিসি তৌহিদুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, তারা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রে যান। পরে বিমানের কর্মকর্তারা পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেন। যুগ্ম সচিব সাঈদ কুতুবও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে, উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থীরা পরে জানতে পারেন, বাকি কেন্দ্রগুলোতে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিমানের পরিচালক প্রশাসন সিদ্দিকুর রহমান পরীক্ষা স্থগিত করা হবে না বলে জানান। পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সব সিদ্ধান্ত বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিলুল আজিমের।”
তবে শুক্রবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিলম্বিত পরীক্ষার নোটিশের বিষয়ে কোনো জবাব দেননি শফিলুল আজিম। তিনি জানান, সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে ঢাকা-নারিতা ভ্রমণের প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন।
শফিলুল আজিম জাপানে থাকায় গত পাঁচ দিন ধরে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান এয়ারওয়েজের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পরীক্ষা বিলম্ব নিয়ে বিভ্রান্তি
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিমানের প্রশাসনিক পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বৃষ্টির কারণে সব কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ে প্রশ্ন দিতে না পারায় পরীক্ষা বিলম্বিত হয়েছে।”
পরীক্ষা না হওয়ার জন্য উত্তরা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষকেও দায়ী করেন তিনি।
তবে কলেজের অধ্যক্ষ ফরিদুজ্জামান বলেন, “পরীক্ষা বিলম্বের বিষয়ে আমরা সেদিন বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটে কুর্মিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল খালেকের কাছ থেকে একটি ই-মেইল পেয়েছি। আমরা এর বেশি কিছু জানি না।”
গত ১০ বছর ধরে বিমানের পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন আবদুল খালেক। তিনি জানান, পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট আগে বিমানের প্রশাসনিক পরিচালক তাকে ডেকে পাঠান। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ চলমান থাকার কারণে পরীক্ষা এক ঘন্টা দেরিতে শুরু হবে এই বিষয়টি সবাইকে জানানোর জন্য নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, “বিমানের মানবসম্পদ ডিজিএম সামসুদ্দোহা আখন্দ বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে প্রশ্নপত্র নিয়ে আমাদের কেন্দ্রে আসেন।”
সব পরীক্ষাকেন্দ্রের সুপারভাইজারদের কাছে আব্দুল খালেকের পাঠানো ফোন টেক্সট বার্তার একটি অনুলিপি পেয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন। যেখানে তিনি লিখেছেন, “দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা এক ঘণ্টা বিলম্বিত হবে।”
একাধিকবার নোটিশের তারিখ পরিবর্তন বিমানের
পরীক্ষার দিন বিমান তাদের ওয়েবসাইটে একটি বিজ্ঞপ্তি আপলোড করে।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিজ্ঞপ্তিতে কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সইও ছিল না।
ঢাকা ট্রিবিউন বিমানের ওয়েবসাইটে পরীক্ষার দিন (১ সেপ্টেম্বর) আপলোড করা নোটিশের কপিতে পরীক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রমাণ পায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অনিবার্য কারণে লিখিত পরীক্ষা বিকেল ৩টার পরিবর্তে বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে।
পরীক্ষার দিন পরীক্ষা কমিটির সকল সদস্য ও কর্মকর্তারা পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা অবস্থায় কীভাবে বিজ্ঞপ্তিটি আপলোড করা হয়েছে জানতে চাইলে বিমানের পরিচালক প্রশাসন সিদ্দিকুর রহমান স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
দুই দিন পর ঢাকা ট্রিবিউন দেখতে পায়, ১ সেপ্টেম্বর আপলোড করা নোটিশের তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ আগস্ট করা হয়েছে। পরীক্ষার দিন বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটে সাতটি পরীক্ষা কেন্দ্রে বিমানের উপ-ব্যবস্থাপক (নিয়োগ ও স্টাফিং ইউনিট) সাদিয়া সাত্তারের পাঠানো বিজ্ঞপ্তির একটি ই-মেইলের কপি ঢাকা ট্রিবিউন পেয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রশাসনের পরিচালক প্রথমে বলেন, “তিনি বিমানের জিএম (আইটি) আনোয়ার হোসেনকে নির্দেশ দিয়েছেন।”
তবে বিমানের আইটি বিভাগ জানিয়েছে, জিএম (আইটি) আনোয়ার হোসেন পরীক্ষার দিন বিমানের সদর দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন না। বিজ্ঞপ্তিটি আপলোড করার বিষয়ে কোনো অফিসিয়াল নির্দেশনা তারা পাননি।
রবিবার, সিদ্দিকুর রহমান তার বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, “তিনি অন্য জিএমকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কে সেই কর্মকর্তা তা স্পষ্ট করেননি তিনি।”
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কমিটির সদস্য জিএম (অ্যাডমিন) বুশরা ইসলাম জানান, তাকে বিমানের সদর দপ্তর ও পরীক্ষা কেন্দ্রে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রশাসনের পরিচালক।
২৮ আগস্ট পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে বুশরা ইসলামকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কমিটিতে যুক্ত করা হয়। তবে কমিটি গঠন করা হয় গত ১৫ জানুয়ারি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (প্রশাসন) সিদ্দিকুর রহমান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে জিএম মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আহমেদকে প্রশ্ন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন।
উল্লেখ্য, নিজাম ২০২২ সালের ২১ অক্টোবর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
পরবর্তীতে ১৪ জুন সরকার নিজামকে অপসারণ করলে বিমান পরিচালক কিছুটা সময়ক্ষেপন করেন ও পরীক্ষার দুই দিন আগে বুশরা ইসলামকে কমিটিতে যুক্ত করেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিভাগীয় তদন্ত ও নতুন পরীক্ষার তারিখ দাবি প্রার্থীদের
উত্তরা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য একটি নতুন তারিখ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে। এক পরীক্ষার্থী বলেন, “বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলার পর প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কমিটি পরীক্ষা বাতিল করে।”
আরেক পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, “এটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ পরীক্ষা ছিল। যদি পরীক্ষা বাতিল না করা হয় ও বিমান প্রশাসন পরীক্ষা স্থগিত করার বিষয়টি অস্বীকার করে, আমরা পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আদালতে রিট দায়ের করব।”
তারা সরকারের কাছে বিভাগীয় তদন্ত, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও পরীক্ষার নতুন তারিখ নির্ধারণের দাবি জানান।
এর আগে, পরীক্ষার্থীরা আদালতে রিট দায়ের করার পরে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া হয়েছিল।