ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে রাজউক

ঘন ঘন ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে জনবহুল শহর ঢাকার অনেক স্থাপনা। এসব স্থাপনার বিষয়ে আগামী বছর থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। জীবন ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি রোধে দুই দশকের বেশি সময় আগে নির্মিত ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলতে প্রচারণা চালাবে সংস্থাটি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে কয়েক হাজার ত্রুটিপূর্ণ ভবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। স্থাপনাগুলোর নির্মাণ ব্যয়ের ২০% নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যয় করা হলে এগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করা সম্ভব। কিন্তু টাকা বাঁচাতে অনেকেই তা করছেন না। ফলে অপরিকল্পিত স্থাপনার দিকে নজর দেবে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “সরকার ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা জোরদার করলেও দুর্যোগ-সহনশীল ভবন নির্মাণে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এসব তদারকির দায়িত্ব রাজউকের। যারা ভবন নির্মাণ করছেন তাদের অবশ্যই নজরদারি করতে হবে।”

২০০৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি- ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত একটি জরিপে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের প্রায় আড়াই লাখ ভবনকে ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরমধ্যে ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা প্রায় ৭৮ হাজার। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পরের বছরের আগস্ট পর্যন্ত এই সমীক্ষা চালানো হয়।

মাটির নিচে সুয়ারেজ সিস্টেম, গ্যাস পাইপলাইন, ইলেক্ট্রিসিটি সিস্টেম, অপ্রশস্ত রাস্তাসহ- সেবামূলক যে ব্যবস্থাপনাগুলো রয়েছে ভূমিকম্প হলে সেগুলো কতটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে সেটি আমলে নেওয়া হয়েছিল সমীক্ষায়। এই সমীক্ষার পর নড়েচরে বসে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২০১৯ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এস এম রেজাউল করিম সংসদে জানান, ঢাকার ৬৬% ভবন বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দুই লাখ চার হাজার ভবনের ওপর একটি সমীক্ষা চালায় রাজউক। রাজউকের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এক লাখ ৯৫ হাজার ভবনের মধ্যে তারা এক লাখ ৩১ হাজার ভবন নির্মাণে ত্রুটি দেখতে পেয়েছে। বিল্ডিংগুলো নিয়মের তোয়াক্কা না করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল সমীক্ষা প্রতিবেদনে। এছাড়া ৮,৭৩০টি নির্মাণাধীন ভবনের মধ্যে ৩,৩৪২টি ভবন রাজউকের অনুমোদিত নকশা মেনে তৈরি করা হচ্ছিল না। পরে ১,৮১৮টি বহুতল ভবনের মালিককে নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় রাজউক। তবে পরবর্তীতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

তবে নতুন নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্দেশনা অনুসরণ এবং অনুমোদিত প্রকৌশলী ও পরামর্শদাতাদের কাছ থেকে নকশা অনুমোদন নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজউক। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে সফটওয়্যার তৈরি করেছে সংস্থাটি।

রাজউক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান জানান, সফটওয়্যারটি গত ১৮ নভেম্বর চালু হয়। তালিকাভুক্ত দুইশোটিরও বেশি স্ট্রাকচারাল আর্কিটেক্ট ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে তাদের। নির্মাণপ্রতিষ্ঠান প্রকৌশলী বাছাই করে তাদের নিয়োগ দেবে।

তিনি বলেন, “আমরা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সম্মতিতে একটি ভবনের অনুমোদন নিশ্চিত করব। এরপর কোনো ধরনের সমস্যা হলে প্রকৌশলীকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে। এরপরও রাজউকের অনুমোদন ছাড়া কেউ ভবন নির্মাণ করলে আমরা তা ভেঙে ফেলতে পদক্ষেপ নেব। ভূমিকম্প সহনশীলতা ও অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা।”

কোনো স্থাপনা ভূমিকম্প-প্রতিরোধী কিনা তা পরীক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত রাজউক। সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা তাদের সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করব। সচেতনতা তৈরিতে রাজউক প্রচারণা চালাবে।”