চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না যানবাহনের গতি। টানেলের ভেতরে গতিসীমা বেধে দেওয়া হলেও মানছেন না অনেক চালকরা। উদ্বোধনের পর থেকে এখন পর্যন্ত (তিন মাসে) টানেলের ভেতরে-বাইরে দুর্ঘটনা ঘটেছে সাতটি। এর মধ্যে আনোয়ারা প্রান্তে সংযোগ সড়কে তিনটি এবং পতেঙ্গা প্রান্তে ঘটেছে একটি দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাতজন, আহত হয়েছেন আরও ২০ জন।
টানেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানেলের ভেতর গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা, কার রেসিং, নির্ধারিত গতির চেয়ে কম-বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও গতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াকে দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। এজন্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।”
তিনি বলেন, “টানেলের ভেতর-বাইরে স্পিড ক্যামেরা বসানোর বিকল্প নেই। বর্তমানে সিসি ক্যামেরা দিয়ে টানেলে যানবাহন মনিটরিং করা হচ্ছে। টানেলে মোট ১১০টি সিসি ক্যামেরা আছে। আনোয়ারা প্রান্তে থাকা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে এসব সিসি ক্যামেরা মনিটরিং করা হচ্ছে।”
গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে টানেলের ভেতর একে একে পাঁচটি গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোর মধ্যে তিনটি প্রাইভেট কার ও দুটি মাইক্রো বাস। দুর্ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। তাদের মধ্যে একজনকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
টানেল প্রকল্পের টোল ব্যবস্থাপক বেলায়েত হোসেন বলেন, “একটা গাড়ির গতি কম ছিল, আরেকটির বেশি। বেশি গতির গাড়িটি সামনে থাকা কম গতির গাড়িটিকে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।”
গত ১৬ জানুয়ারি আনোয়ারা প্রান্তে দ্রুতগতির মাইক্রোবাসের ধাক্কায় সিকিউরিটি পোস্ট গুঁড়িয়ে যায়। এতে দায়িত্বরত নৌবাহিনীর এক সদস্যসহ সাতজন আহত হন। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে টানেল সড়কের বৈরাগ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চৌমুহনী থেকে ছয়জন যাত্রী নিয়ে পতেঙ্গা প্রান্তে যাচ্ছিল একটি মাইক্রোবাস। টানেলের সংরক্ষিত সড়কে প্রবেশের আগমুহূর্তে দ্রুতগতির গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিকিউরিটি পোস্টে গিয়ে পড়ে। এতে পোস্টটি গুঁড়িয়ে গেলে দায়িত্বরত নৌবাহিনীর এক সদস্যসহ সাতজন আহত হন।
কার রেসিং
উদ্বোধনের দিন ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে টানেলের ভেতর কার রেসিং-এ মেতে উঠেছিল একদল তরুণ। এই রেসে প্রায় ১০টি প্রাইভেট কার অংশ নেয়। ৩০ অক্টোবর মোটর রেসের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ১ নভেম্বর রাতে এ ঘটনায় নগরীর কর্ণফুলী থানায় মামলা করা হয়। মামলার এজাহারে কারের নম্বর উল্লেখ করে সাতটি কারের অজ্ঞাতনামা চালকদের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়। সড়ক পরিবহন আইনে মামলাটি দায়ের করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল কর্তৃপক্ষের সহকারী ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর আলম।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জহির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “টানেলের ভেতর কার রেসিং ঘটনায় ৯ নভেম্বর নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত মো. আশরাফুল হক ও মো. এমরান উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরও পাঁচজন আসামি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন আছে।”
টোল মওকুফ চায় পুলিশ
দুর্ঘটনা কিংবা কোনো কাজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টানেলে প্রবেশ করলে কিংবা টানেল পার হতে চাইলে দিতে হয় টোল। এ কারণে টানেলে কোনো সমস্যা হলেও পুলিশ সদস্যদের যেতে অনাগ্রহ দেখা যায়। তাই টানেলে দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে ২৩টি গাড়ির টোলমুক্ত সুবিধা চেয়েছে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে টানেল প্রকল্পের টোল ব্যবস্থাপক বেলায়েত হোসেন বলেন, “সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ৪৮টি গাড়িকে টানেলে চলাচলের জন্য টোল ফ্রি করা হয়েছে। এরমধ্যে সিএমপির পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী থানার দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দুটি গাড়ি এবং পুলিশের আরও একটি গাড়িসহ মোট তিনটি গাড়ি টোল-ফ্রি আছে। এর বাইরে সেতু কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কর্ণফুলী ও পতেঙ্গা থানা এলাকার এসি-ল্যান্ড, টানেল মেরামতের সঙ্গে নিয়োজিত মোট ৪৮টি গাড়ি টোল-ফ্রি করা হয়েছে। এর বাইরে যে গাড়ি টানেল পার হতে চাইবে তাকেই টোল দিতে হবে।”
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) এসএম মোস্তাইন হোসাইন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “টানেলে সহজে অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিএমপির ট্রাফিক ও ক্রাইম বিভাগের বন্দর জোনের ২৩টি গাড়ির টোলমুক্ত রাখার জন্য সড়ক ও সেতু বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ট্রাফিক বন্দর-বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “টানেল এরিয়ার মধ্যে পুলিশের কোনো কার্যক্রম নেই। টানেলের বাইরে ট্রাফিক পুলিশ সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করছে। টানেল কর্তৃপক্ষ ভেতরে ট্রাফিক সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে। টানেলের ভেতর প্রবেশ করলে পুলিশের গাড়িকেও টোল দিতে হয়।”
পুলিশ সরকারি কাজে টানেলে যাবে, টোল দেবে কেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “টানেল কর্তৃপক্ষ যেকোনো প্রয়োজনে আমাদের সহযোগিতা চাইলে কিংবা ডাকলে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করে থাকি।”
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শাকিলা সোলতানা বলেন, “বঙ্গবন্ধু টানেল চালুর পর থেকে নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স এটি নিয়ন্ত্রণ করছে। টানেল দিয়ে পুলিশের গাড়ি প্রবেশ করলেও টোল দিতে হচ্ছে। এ কারণে পুলিশ কোনো কারণ ছাড়া টানেলে প্রবেশ করছে না। তবে কর্ণফুলী ও পতেঙ্গা থানার দুই ওসির গাড়ি টোল ফ্রি।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির এক ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, “যানবাহন নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করেন সার্জেন্ট-টিআইরা। তাদের কাছে আছে মোটরসাইকেল। অথচ টানেলের ভেতর মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশে বিধিনিষেধ আছে। পুলিশ কোনো কাজে গেলেও টোল দিতে হচ্ছে। এ কারণে পুলিশের টানেলে যেতে আগ্রহ কম।”
টোল হার
টানেল পাড়ি দিতে প্রাইভেট কার ও পিক-আপ ২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ২৫০ টাকা, বাস (৩১ সিটের কম) ৩০০ টাকা, বাস (৩২ সিটের বেশি) ৪০০ টাকা, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৫ টন পর্যন্ত) ৪০০ টাকা, ট্রাক (৫ দশমিক ০১ থেকে ৮ টন) ৫০০ টাকা, ট্রাক (৮ দশমিক ০১ থেকে ১১ টন) ৬০০ টাকা, ট্রাক ও ট্রেইলার (৩ এক্সেল) ৮০০ টাকা, ট্রাক ও ট্রেইলার (৪ এক্সেল) ১০০০ টাকা টোল দিতে হয়।
গত বছরের ২৮ অক্টোবর টানেলের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরদিন সেটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। টানেল খোলার পর থেকে কার রেসিং, প্রাইভেট কারের পেছনে দ্রুত গতির বাসের ধাক্কা দেওয়া, টানেলের ভেতর সেলফি তোলা এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে টোল প্লাজার ব্যারিয়ারে ধাক্কা দেওয়ার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।