বেইলি রোডে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে?

ঢাকার বেইলি রোডের গ্রিন কোজি ভবনে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২২ জন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার ৫০ মিনিটের দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে। হতাহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সূত্রপাত ও পরবর্তী ঘটনা

ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ধারণা, গ্যাসের লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। সেই আগুন ছড়ায় দোতলায়। মুহূর্তেই তা ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ক্রেনের সাহায্যে ভবনের ওপরের তলাগুলো থেকে আটকে পড়া মানুষকে নামানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। 

টিটু নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, আগুনের চেয়ে ধোঁয়ায় বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির ভেতরে থাকা বেশিরভাগ মানুষেরই ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ভবনটির তৃতীয় তলায় একটি পোশাকের দোকান ছাড়া অন্য সবগুলোতে খাবারের দোকান ছিল। এসব রেস্টুরেন্টে অনেক গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, বিল্ডিংয়ের ভেতরে বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার রাখা ছিল। সেগুলোতে আগুন ধরে যাওয়ায় লোকজন বের হতে পারেননি। আগুন ধরার কিছু সময় পর এক এক করে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হচ্ছিল। ভবনের পুরো ভেতরটা ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়।

যা বললেন র‌্যাবের ডিজি

এ ঘটনায় র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন বলেছেন, ‘‘নিচতলায় একটা ছোট দোকান ছিল, সেখান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়েছে। এখানে অধিকাংশ যেহেতু রেস্টুরেন্ট ছিল, সেহেতু অনেক গ্যাস সিলিন্ডারও ছিল। সেগুলোতেই আগুন ছড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাই ধারণা করা হচ্ছে।’’

শুক্রবার (১ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আহতদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকের এসব কথা বলেন তিনি।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, অধিকাংশ মানুষই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধে মারা গিয়েছেন। ভবনটিতে একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল। দুটি লিফট ছিল। ফলে আগুন লাগার পর কেউ নামতে পারেনি। কেউ বলছিলেন উপরে আগুন লেগেছে, কেউ বলেছেন নিচে। ফলে মানুষ কোনদিকে যাবে তা বুঝতে পারেনি। 

ভবনটিতে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘ভবনটির জরুরি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল, তা দিয়ে তারা চেষ্টা করেছে। তবে পরে যখন অনেকগুলো সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে তখন আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।”

এম খুরশীদ হোসেন আরও বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আমাদের যদি মনে হয় এখানে ইনভেস্টিগেশন করা প্রয়োজন, তাহলে আমরা সেটি করব। আমাদের ইন্টেলিজেন্স উইং এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছে।”

সর্বশেষ পরিস্থিতি

বেইলি রোডের সেই ভবনটি সাততলা। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল “কাচ্চি ভাই” নামের একটি খাবারের দোকান। তৃতীয় তলায় একটি পোশাকের দোকান ছাড়া ওপরের সব তলায় ছিল খাবারের দোকান। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও খাবারের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় জমে। আনুমানিক রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে এবং রাত ১১টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগুনে মোট মৃত্যু ও লাশ হস্তান্তর কার্যক্রম

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মারা গেছেন। বেশির ভাগের শ্বাসনালী পুড়ে ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২ জন।

শুক্রবার ভোর ৫টা ৪১ মিনিটে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর শুরু হয়েছে। হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। এখন পর্যন্ত ৩৮ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি তিন জনের লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পাঁচ জনের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা সেবা পরিদর্শনে সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইউনিটে এসে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। এছাড়াও মন্ত্রী জানান, আহতদের সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা হবে।