মিরপুর টাউন হল এখন আবর্জনার ভাগাড়

ঢাকার মিরপুর টাউন হল। এই এলাকার সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণবন্ত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল এই জায়গাটি। তবে যথাযথ ব্যবস্থার অভাবে এটি এখন শুধুই একটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

এটিকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম যেমন বন্ধ হয়েছে। বিপাকে পড়েছেন এই টাউন হলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দোকানপাটের ব্যবসায়ীরা।

প্রাণবন্ত টাউন হলের পাশে মার্কেটে এক সময় বইয়ের দোকান করতেন সুজন। ছোট থেকে বেড়ে ওঠা এখানেই। তবে চোখের সামনে টাউন হল হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। ঢাকা ট্রিবিউনকে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, আমাদের বেড়ে ওঠার পুরোটা জুড়ে ছিল ‘মিরপুর টাউন হল’। ১৯৮৬ সাল থেকে আব্বার সঙ্গে সেখানে যাতায়াত। তবে ২০০৩ সালে এক চিঠিতেই সব শেষ। মাত্র এক সপ্তাহের নোটিশে উচ্ছেদ করা হয় দোকানদারদের। কোথায় যাব কি করব ভাবতে ভাবতেই সবটা শেষ হয়ে যায়। অনেক মালামাল ভেতরে রেখেই মার্কেট ভাঙা শুরু করা হয়। তারপর থেকে তো প্রায় ১৫-১৬ বছর পার হয়ে গেল। আমরা অধিকাংশ দোকানদারই এখন ফুটপাতে বসি। মার্কেটের ভেতরে দোকান দিয়ে বসার মতো পুঁজি আমাদের নেই।’’

তিনি জানান, টাউন হল মার্কেট ছিল বিস্তীর্ণ মাঠের মতো। ছাপাখানা, গহনার দোকান, মুদি দোকান এবং বইয়ের দোকানসহ প্রায় ৩,৫০০ দোকান ছিল সেখানে। দোকানপ্রতি ভাড়া ছিল ৩-৪ হাজার। কারো কারো একাধিক দোকান ছিল। বইয়ের দোকানই ছিলো ১৮-১৯ টা।

সুজন বলেন, ‘‘মার্কেট বন্ধের ২০ বছর কেটে গেছে। আমরা অনেকেই এখন ফুটপাথে ব্যবসা করি। দোকানে ব্যবসা করার মতো টাকা আমাদের কাছে নেই।’’

তিনি বলেন, “এখন এই জায়গাটি আবর্জনার ডিপোতে পরিণত হয়েছে। এই জায়গার একটি অংশ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), আরেকটি নিয়েছে হাবিব গ্রুপ। আরেকটি ব্যক্তি মালিকানা ছিল তাদের সঙ্গে দীর্ঘ মামলার পর জায়গা সমস্যা মীমাংসা হয়। মার্কেট উচ্ছেদের সময় শত শত ব্যবসায়ী বিপাকে পড়ে।” জানালেন, অনেকেই ব্যবসা ছেড়েছেন। কেউ শাহ আলী প্লাজার পেছনে কেউ ফুটপাতে, কেউ কেউ প্রতিদিন ১০০ টাকা দিয়ে সুইমিং পুলের সামনে দোকান বসাচ্ছেন।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বই বিক্রেতা বলেন, “মসজিদসহ জায়গাটি নিয়ে সিনেমাহলসহ বড় মার্কেট করবে কিন্তু মসজিদ ভাঙতে দেয়া হয়নি। তাই দুই দিকে দুইটা মার্কেট করা হয়েছে। একটি এফ এস স্কয়ার, আরেকটির কাজ শেষ হয়নি। টাউন হলের মূল অংশটি ময়লার ডিপো আর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।”

সোমবার (১৮ মার্চ) সরজমিনে মিরপুর-১০ এ মিরপুর টাউন হল মার্কেটের জায়গাটি। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান পাশের ঢাকা উত্তর সিটির ওয়্যার হাউজ, এরপর বিশাল জায়গায় ময়লা তোলার ভেকু, ময়লা বহনকারী ট্রাক, গাড়ী পার্কিংয়ের জায়গা। ভেতরে একপাশে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের অফিস। ভেতরে আরেকটু ঢুকতেই উত্তর সিটির ৪ নম্বর অঞ্চলের কার্যালয়।

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি

১৯৭৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই টাউন হলকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাজারটি এ এলাকায় খুবই জনপ্রিয় ছিল। অনেকে একে মিরপুর রোডের নিউমার্কেট ও নীলক্ষেতের সঙ্গে তুলনা করতেন। তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে এবং মিরপুর উন্নয়ন কমিটির তত্ত্বাবধানে টাউন হলটি নির্মাণ করা হয়। টাউন হলটি শুধু বই বা বিপনীবিতানের জন্য নয় মিরপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য সবসময় জমজমাট ছিল।

তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় হলটি ২০০৩ সালে ভেঙে ফেলা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন সিটি মেয়র সাদেক হোসেন খোকা একই স্থানে একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ঘোষণা দেন। সেখানে মার্কেট নির্মাণের জন্য একটি বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সিটি কর্পোরেশন। মার্কেট তৈরির সেই প্রক্রিয়া শুরু হলেও এলাকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ‘‘ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের’’ মুখে তা বন্ধও হয়ে যায়। ওই আন্দোলনে একাত্ম হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, পথনাটক পরিষদসহ অনেকে। তবে শেষ পর্যন্ত সে আন্দোলন টেকেনি।

২০০৭ সালে স্বাধীনতা উৎসবের এক অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী মিরপুরে টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ করার দাবি জানান। সেটি ‘‘শহীদ মুনীর চৌধুরীর’’ নামে নামকরণের প্রস্তাব দেন।

এরপর, ২০১৩ সালে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে টাউন হলের শূন্যস্থানে একটি মুক্তমঞ্চ তৈরি করেন। তবে সেখানে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি রাখায় জায়গাটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপযোগী নয়।

মিরপুরে সাংস্কৃতিক চর্চার উপযুক্ত জায়গা না থাকায় এখানকার সংস্কৃতিকর্মীদের পক্ষে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু সংখ্যক সংগঠন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কাজ করে গেলেও মিরপুর থেকে গিয়ে শিল্পকলা একাডেমিকেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চার সীমাবদ্ধতা সংস্কৃতি কর্মীদের বিমুখ করছে। অপরদিকে নাট্যমঞ্চ তৈরিতে দীর্ঘসূত্রিতা ৬০ লক্ষাধিক জনবসতির মিরপুরের সাধারণ জনগোষ্ঠীকে সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কহীন করে তুলছে। ২০২২ সালের আগস্টে আবারও ‘‘অপেরা’’ নামে একটি নাট্য সংগঠন ‘‘নাট্যমঞ্চ’’ করার জন্য প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। এরপর সেপ্টেম্বরে মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের নেতৃত্বে সেটি আন্দোলনে রূপ নেয়। সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় তারা বিষয়টি নিয়ে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলবে।

২০২২ সালের নভেম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক হয়। তিনি বলেছিলেন, টাউন হলের জায়গায় তিন বছরের মধ্যে নাট্যমঞ্চ করে দেবেন এবং তার দুই প্রতিনিধির সঙ্গে মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলেন। নগর ভবনে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকে ফোরামের সদস্য ছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এর সভাপতি গোলাম কুদ্দুস ও সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এরপর সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত দিবসে মেয়র আবার জনসম্মুখে ঘোষণা দেন, মঞ্চ করে দেবেন। এরপর এক বছর দুই মাস কেটে গেলেও ডিএনসিসি কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়নি, আবার মিরপুর সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরাম বা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকেও কোনো আলোচনা নেই।

মিরপুরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি একজন সমাজসেবকও। আমার একটি সাংস্কৃতিক দলও আছে। মিরপুরে থিয়েটার হলের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম।’’

তিনি বলেন, “বর্তমান মেয়র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আমাদেরকে একটি অত্যাধুনিক হলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি একটি বড় প্রকল্প। তাই সময় লাগছে। তবে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে ইতোমধ্যে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। আশা করি এ সেশনে আমরা এ কার্যক্রমের টেন্ডার আহ্বান করতে পারবো।’’

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মীর খায়রুল আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি তো এখানে নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। তাই ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারছি না।’’