কুমিল্লার হাটে একদিনে মাছ বিক্রি হয় ৬ কোটি টাকার

কুমিল্লা জেলার ঐতিহ্যবাহী অস্থায়ী মাছের হাট বসে পদুয়ার বাজারে। সপ্তাহে দুদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য সড়কের ওপর বসা এ অস্থায়ী প্রতি হাটে বেচাবিক্রি হয় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার মাছ। কমদামে দেশি ও সামুদ্রিক মাছ কিনতে প্রতি হাটে থাকে মানুষের উপচেপড়া ভিড়।

কুমিল্লা নগরীর টমছম ব্রিজ থেকে লাকসাম সড়কের ওপর প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে পদুয়ার বাজারে প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য হাট বসে সড়কের ওপর। বিকেল থেকে বেচাকেনা শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ১০টার দিকে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ আসে এ হাটে। এক হাটে সব রকমের মাছ পেয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ও সাপ্তাহিক বাজার করে নেন ক্রেতারা। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের হাকডাকে সরগরম থাকে এ বাজার।

ব্যবসায়ীরা জানান, এখানে প্রতি হাটে ছোট বড় প্রায় ৩০০ দোকান বসে। দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ মেট্রিক টন মাছ বিক্রি হয় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে। যার মূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা। সপ্তাহে দুদিন করে মাসে আট থেকে দশটি হাট বসে পদুয়ায়।

কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসে দেশি মাছ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রুই কাতল, শিং, মাগুর, কৈ, টাকি, শোল, টেংরা, পাবদা, পুঁটি, বোয়াল, আইড়, বাইন, গজার প্রভৃতি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, মৃগেল, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প, বিগহেড ও কমনকার্প মাছ।

এ হাটে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও চাঁদপুরের ব্যবসায়ীরা আনেন ইলিশ। চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা আনেন সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে রয়েছে চাপিলা, লইট্যা, সুরমা, কোরাল, টুনা, রূপচাঁদা, বাটা, বাইলাসহ অন্যান্য মাছ। সামুদ্রিক কাঁকড়াও বিক্রি হয় এখানে।

কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজ শাকতলা, জাঙ্গালিয়া, কচুয়া চৌমুহনী, সদর দক্ষিণ উপজেলার রাজাপাড়া, দিশাবন্দ, নোয়াগাঁও, মোস্তফাপুর, বেলতলি, কোটবাড়ি, সুয়াগাজী, মিয়াবাজার, চৌয়ারা, কালিকাপুর, লালমাই, বাগমারা, বিজয়পুর, বিজরা, মুদাফফরগঞ্জ, পিপুলিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলার ক্রেতারা মাছ কিনতে আসেন এখানে।

সড়কের পাশে গাড়ি রেখে মাছ কিনেন অনেকে। বিয়ে, জন্মদিনসহ বড় অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার ও জেলার অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো পাইকারি দামে মাছ সংগ্রহ করেন পদুয়ার বাজার হাট থেকে। সব ধরনের মাছ এ হাটে একসঙ্গে পাওয়া যায়। মাছের সরবরাহ বেশি হওয়াই ক্রেতার সমাগমও ঘটে বেশি। ফলে বেচা-বিক্রিতে খুশি ব্যবসায়ীরা। এ হাটে মাছ কেটে অনেকের ভালো আয় হয়।

নগরীর কালিয়াজুড়ি থেকে আসা ক্রেতা ফরহাদ হোসেন বলেন, “বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান আছে। তাই এ বড় বাজারে আসলাম। এখানে সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এখান থেকে ৭০ কেজি মাছ কিনলাম। অন্যান্য বাজার থেকে মাছের দামও কিছুটা কম। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো।”

রেইসকোর্স এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, “এখানে মাছের সরবরাহ বেশি, তাই যেকোনো মাছ কিনতে বেগ পেতে হয় না। সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়, তাই সপ্তাহের মাছ বাজারটি থেকে সংগ্রহ করি।”

সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী এলাকা থেকে আসা ক্রেতা ফরিদ উদ্দিন বলেন, “আমরা সাপ্তাহিক বাজারসহ যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য মাছ কিনতে হলে এখানে চলে আসি। দেশি, সামুদ্রিক মাছ থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ এ বাজারে আসে।”

নগরীর টমছম ব্রিজ এলাকার এক হোটেল ব্যবসায়ী আজাহারুল বিপুল জানান, শহরের হোটেল ব্যবসায়ীরা হাটের শেষের দিকে পদুয়ার বাজারে মাছ কিনতে যান। শেষ সময়ে মাছ ব্যবসায়ীরা কম দামে মাছ ছেড়ে দেন। এতে আমাদেরও সাশ্রয় হয়, আবার অস্থায়ী বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা তাদের বেচাবিক্রি শেষ করে চলে যেতে পারেন।

বাজারে মাছ কাটেন শাহ আলম নামের এক শ্রমিক জানান, প্রতি হাটে এখানে মাছের মেলা বসে। প্রতিহাটে আমরা ১৫ মণের বেশি মাছ কাটি। মাছ বেশি আসে, বিক্রিও হয় বেশি। আর আমাদের আয় রোজগার ভালো হয়। প্রতি কেজি মাছ কাটতে প্রকারভেদে ১০ থেকে ৪০ টাকা করে নেই।

সিরাজ মিয়া নামে মাছ ব্যবসায়ী জানান, এখানে সরাসরি মাছ এনে বিক্রি করি। কোনো আড়তদার নেই। যা লাভ হয় নিজেদেরই থাকে। আর অস্থায়ী বাজার হওয়াই আমরাও সীমিত লাভে মাছ বিক্রি করে চলে যাই। সপ্তাহের বাজারে ভালোই আয় হয়।

মাছ ব্যবসায়ী শাহাজান মিয়া জানান, চট্টগ্রাম ফিসারি ঘাট থেকে সামুদ্রিক মাছ নিয়ে হাটে আসেন তিনি। এ মাছের চাহিদাও ভালো, বেচাবিক্রিও ভালো। প্রায় ২০ ধরনের সামুদ্রিক মাছ নিয়ে পসরা বসিয়েছেন তিনি।

দাউদকান্দি থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ী জুলহাস মিয়া জানান, স্থানীয় দাউদকান্দি মাছের প্রজেক্টসহ চান্দিনা ও আশপাশের এলাকা থেকে মাছ সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। দেশি মাছের চাহিদা ভালো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাছ বিক্রি করে চলে যাই।

এ বাজারে মাছ কাটেন মিলন মিয়া। তিনি বলেন, “সপ্তাহে দুদিন আমরা এ বাজারে মাছ কাটতে আসি। সব খরচ বাদ দিয়ে সপ্তাহে ৫/৬ হাজার টাকা লাভ হয়। মাসে আমার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা রোজগার হয়।”

এ বাজারের ইজারাদার মো. কামাল হোসেন জানান, প্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ বাজারটি। প্রতি সপ্তাহে এ বাজারে প্রায় ৩০০ মাছের দোকান বসে এখানে। কোনো আড়তদার নেই, আমরা সামান্য পরিমাণ খাজনা নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই স্বচ্ছন্দে এখানে বেচাবিক্রি করতে পারেন।