রাজধানীর সাত কলেজের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি ২০১৭ বাতিল করা হয়। এরপর সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত হয়। অধিভুক্তির পর থেকে এইসব কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের বিভিন্ন দাবিতে একাধিকবার রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেন।
সর্বশেষ এ বছরের মার্চ মাসে শিক্ষার্থীরা আবারও তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসার পর “ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়” গঠনের প্রস্তাব করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে সাত কলেজের জন্য একজন প্রশাসকও নিয়োগ করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ঢাকা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াসকে সাত কলেজের প্রথম প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করে।
এই সাতটি কলেজ হলো: ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি বালিকা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ।
সম্প্রতি গঠিত “ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়” কার্যক্রম শুরু করার জন্য কী কী প্রস্তুতি নিচ্ছে তা জানার চেষ্টা করেছে ঢাকা ট্রিবিউন।
ভর্তি প্রক্রিয়া
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাবি প্রশাসন জানিয়েছিল যে, তাদের অধীনে ২০২৪-২৫ সেশনে সাত কলেজ থেকে আর কোনো নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে না। তবে, বর্তমান শিক্ষার্থীরা ঢাবির অধিভুক্ত থেকে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।
এর ফলে এই কলেজগুলোতে পরবর্তী ভর্তি প্রক্রিয়া কিভাবে সম্পন্ন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক অধ্যাপক ইলিয়াস একমত হয়ে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটা একটা চ্যালেঞ্জ। তবে, দ্রুতই এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যদিও এখনও এই কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়নি।
শিক্ষক পদায়ন এবং এইচএসসি শিক্ষাক্রম
কলেজগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষাক্রম চালু আছে, তাই তাদের কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঢাকা ট্রিবিউনকে অধ্যাপক ইলিয়াস নিশ্চিত করেছেন, ওইসব কলেজগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে পাঠ্যক্রম চালু থাকবে।
এদিকে, এই সাত কলেজে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষক রয়েছেন, যারা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর সরকারি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া একবারেই আলাদা। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি আরেকটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে।
এক প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ইলিয়াস বলেন, “ইউজিসি আমাদের দুটি বিষয় নিশ্চিত করেছে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম কলেজগুলোতে থাকবে আর শিক্ষকদের পদায়ন যেমন ছিল তেমনই থাকবে।”
ডিসিইউ-র মডেল
বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি কলেজ প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আলাদা অনুষদ হিসেবে কাজ করবে।
তবে অধ্যাপক ইলিয়াস জানান, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো কেমন হবে তা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।
এছাড়া, কলেজগুলোর অবস্থান রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হওয়ায় কিছু শিক্ষার্থীরা ক্লাস বা শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য যাতায়াত একটি সমস্যা হয়ে দেখা দেবে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই উদ্বেগের বিষয়ে একমত হয়ে অধ্যাপক ইলিয়াস ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে প্রতিটি কলেজকে স্বাবলম্বী করার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, “আমরা শিক্ষা কার্যক্রম ও এ সংক্রান্ত পরিষেবার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছি, যাতে শিক্ষার্থীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে দৌড়াতে না হয়।”
তার মতে, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিষেবাগুলো সব কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বসেই নিতে পারবে।
তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম একটি হাইব্রিড মডিউল অনুসরণ করবে যেখানে ৬০% ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকতে হবে এবং বাকিগুলো তারা অনলাইনে করতে পারবে।
আবাসন ব্যবস্থা
আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ইলিয়াস বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি, শ্রেণিকক্ষের আকারের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সমানুপাতিক হওয়া উচিত। এ দাবি মানা হলে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।”
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে তাদের আবাসন ব্যবস্থা করা সহজ হবে। আশা করি সরকার থেকে এ জন্য দ্রুত তহবিল বরাদ্দ করা হবে।”
অধ্যাপক ইলিয়াস বলেন, “ছাত্রদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যে পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে আমরা আশা করি তা সকলের কল্যাণ বয়ে আনবে। যদি রাষ্ট্র যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সকলপক্ষ আগ্রহ, আস্থা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করে, তাহলে এ উদ্যোগ অবশ্যই সফল হবে।”
যদিও ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপরেখা এখনও প্রকাশিত হয়নি তবুও হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই ঐতিহ্যমণ্ডিত কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।