১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধাদের যেসব গান সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...।” গানটির সুরকার ও গায়ক আপেল মাহমুদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। তবে একুশে পদকজয়ী এই শিল্পীর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) অভিযোগ করেছিলেন এক ব্যক্তি। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জামুকার শুনানিতে হাজির হয়ে আপেল মাহমুদ প্রমাণ দিয়েছেন, তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ দিতে সোমবার (২ জুন) কুমিল্লা সার্কিট হাউসে জামুকার শুনানিতে হাজির হন আপেল মাহমুদ।
শুনানি শেষে জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন জানান, গীতিকার আপেল মাহমুদ নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করতে পেরেছেন।
জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে কুমিল্লা জেলা থেকে ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধা নন, এমন অভিযোগ আসে। সেসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে দুটি কমিটিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আপেল মাহমুদ প্রমাণ করেছেন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। আপেল মাহমুদ যদি শুধু গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করার মতো ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকতেন, তাহলেও তিনি সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খেতাব পেতেন; কিন্তু তিনি কাগজপত্রে প্রমাণ করেছেন তিনি সম্মুখযোদ্ধা ছিলেন। তাই তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি নিশ্চিত।
জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন গীতিকার আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনি মুক্তিযোদ্ধার নন বলে অভিযোগ করেন।
শুনানি শেষে বের হয়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের সামনে আপেল মাহমুদ সাংবাদিকদের “আপেল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেটা আমাকে জীবিত থেকেই দ্বিতীয়বার প্রমাণ করতে হয়েছে। আমি মুক্তিযোদ্ধা নই দাবি করে যেই অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি ভুল প্রমাণিত হওয়ায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্যরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।”
তিনি বলেন, “মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে আমি ৩ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করেছি, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের কমান্ডে যুদ্ধ করেছি। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত আমরা নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছি। নরসিংদী থেকে আমরা চলে যাই ক্যাপ্টেন নাসিমের আন্ডারে আশুগঞ্জে। সেখানে আমরা ভৈরব রামনগর ব্রিজে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করি। সেখান থেকে রামনগর ব্রিজ, ভৈরব, আশুগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চুনারুঘাট, চানপুর টি স্টেট, তেলিয়াপাড়া টি স্টেটে যুদ্ধ করেছি। তেলিয়াপাড়া ১৯৭১ সালে আমার শেষ যুদ্ধক্ষেত্র ছিল। আশুগঞ্জের যুদ্ধের সময় আমার বাঁ চোখের পাশে আঘাতপ্রাপ্তও হয়।”
পরে তাকে আগরতলায় নিয়ে যাওয়া হয় উল্লেখ করে আপেল মাহমুদ আরও বলেন, “সেখানে আবদুল জব্বার ভাইও আসেন। ২৫ মে কলকাতায় বড় করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতেই আমাকে এবং জব্বার ভাইকে শরণার্থীদের জন্য একটি অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। আমরা দুই দিন অনুষ্ঠান করে অনেক শিল্পী পাই। ১ জুন থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমার ওপর যে দায়িত্ব ছিল, তা ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতার বা রেডিও বাংলাদেশ যা–ই বলেন না কেন, সেই দায়িত্ব পালন করেছি। আমি তো মনোয়ার হোসেনের কোনো ক্ষতি করিনি, জানি না তিনি কেন এমন করলেন। তার ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে বেঁচে থাকা অবস্থায় আমাকে প্রমাণ করতে হয়েছে যে আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।”
কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আপেল মাহমুদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী নাসরিন মাহমুদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক মনোরঞ্জন ঘোষাল, বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফুল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হায়াত খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ সাহাসহ কয়েকজন।
প্রসঙ্গত, আপেল মাহমুদ কুমিল্লার সন্তান। তিনি জেলার মেঘনা উপজেলার বাসিন্দা। এ জন্য জামুকায় তার বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগটির বিষয়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে শুনানি হয়। শুনানিতে জামুকার মহাপরিচালক শাহিনা খাতুনসহ সাত সদস্যদের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।
আপেল মাহমুদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি” গানের গায়ক হিসেবে পরিচিত হলেও তার আরও বেশ কিছু গান আজও মানুষের হৃদয়ে রয়েছে। “তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে... ” গানটিও তার একটি বিখ্যাত গান। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হন। দেশাত্মবোধক গান ছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত, লালনগীতি, গণসঙ্গীত ও আধুনিক ধারার গান গেয়ে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছেন আপেল মাহমুদ।