ঝিনাইদহ শহরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মাণাধীন একটি ভাস্কর্য অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, ভাস্কর্যটির সঙ্গে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত অবয়ব ও ছবির কোনো সাদৃশ্য ছিল না। পাশাপাশি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড়ে নির্মিত হওয়ায় যান চলাচলে ঝুঁকিও সৃষ্টি করছিল। এসব কারণেই স্থাপনাটি অপসারণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু এবং জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ এর উদ্বোধন করেন। প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু হওয়ার পর অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে স্থাপনাটি অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আলী খান জানান, কেন নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছিল সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইলও বর্তমানে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গেছে, নির্মাণকাজ আংশিক শেষ হওয়ার পরই সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে তৎকালীন সময়েই কাজ স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির একাধিক সভায় স্থাপনাটি অপসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে অপসারণ কাজ চলছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী আবু সাঈদ বলেন, ‘‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান আমাদের গর্ব। কিন্তু তার নামে যে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিতে তার প্রকৃত অবয়ব বা ছবির কোনো প্রতিফলন ছিল না। নান্দনিকতারও ঘাটতি ছিল। একটি অনাকর্ষণীয় পাথরের কাঠামোকে তার নামে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’’
ঢাকা-ঝিনাইদহ ও যশোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে স্থাপনাটি নির্মিত হওয়ায় যান চলাচলেও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘মহাসড়কের মাঝখানে উঁচু বেদির কারণে এক পাশের যানবাহন অন্য পাশ থেকে দেখা যেত না। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতো।’’
জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ বলেন, ‘‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান দেশের গর্ব। তার নামে অসুন্দর বা বাস্তব অবয়বের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা তার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নয়। প্রকৃত ছবি ও অবয়ব অনুসরণ করে নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলে আজ এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘অতীতে পরিকল্পনাহীনভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, যা জননিরাপত্তার বিষয়টিকেও উপেক্ষা করেছে।’’
সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাস্কর্য অপসারণের বিষয়টি দেখেছি। তবে সেখানে প্রকৃত অর্থে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো স্বীকৃত ভাস্কর্য ছিল বলে আমাদের জানা নেই। এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবশ্যই জানানো হতো।’’
জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘‘স্থাপনাটি আসলেই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি তার প্রকৃত ছবির সঙ্গে মিলেও না। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনের মাঝখানে থাকায় সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছিল।’’
তিনি জানান, জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থাপনাটি অপসারণ করা হচ্ছে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের প্রকৃত ছবি ও অবয়বের আদলে একটি নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



