“সক্ষমতাকে দেখো, অক্ষমতাকে নয়” প্রতিপাদ্যে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো’র সহযোগিতায় গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন “সমষ্টি” গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী সমতা বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তারই অংশ হিসেবে বুধবার (২৫ জুন) রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর মিলনায়তনে “প্রতিবন্ধী সমতা শক্তিশালীকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা” শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং শিক্ষাবিদ দিলারা জামান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ হিরুজ্জামান, দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ।
অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন’র সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ আহমেদের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে ছিলেন- মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এবং আইসিবিসি প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল কাদির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান ইমরান হোসেন, ইউএনডিপির এসপিএসএস সিনিয়র অ্যাডভাইজার-কমিউনিকেশনস এস এম মনজুর রশীদ এবং এ-টু-আই প্রকল্পের জাতীয় পরামর্শক ভাস্কর ভট্টাচার্য।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা রাখনে ইউনেস্কোর ঢাকা অফিসের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রধান নূরে জান্নাত প্রমা। তার বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর নির্মিত একটি ভিডিও চিত্র ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে একটি নাট্যাংশ প্রদর্শন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অভিনেত্রী দিলারা জামান বলেন, “আজকের আলোচনা ও উপস্থাপনাগুলো আমার দৃষ্টি খুলে দিয়েছে। আমি ভালোবেসে আমার পাশের যে প্রতিবন্ধী মানুষটি আছে তার জন্য হাত বাড়িয়ে দেব। এখন থেকে আমি যে কটা দিন বাঁচব, আমি চেষ্টা করব আমার চারপাশে যারা আছে, আমি যাদের সঙ্গে অভিনয় করি, এবং যেসব মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের অনুরোধ করব তোমার পাশে যেসব প্রতিবন্ধী মানুষ আছে তাদের জন্য অল্প সময়ের জন্য হলেও তোমাদের হাত দুটি বাড়িয়ে দাও।”
কবি হেলাল হাফিজ বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভালোবাসতে হবে এবং মাতৃ-মমতায় তাদের কাছে টেনে নিতে হবে। তারা আমাদের মতোই মানুষ, ঘটনাচক্রে তারা প্রতিবন্ধী হয়েছে। কেউ জন্মগত ভাবে প্রতিবন্ধী হয়েছে, কেউ অসুস্থতার জন্য হয়েছে, কেউ দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবন্ধী “
তিনি বলেন, “তারা অন্যভাবে প্রতিভাবান; এটা সৃষ্টিকর্তাই তাদের দিয়েছেন। আমাদের দেশের সামগ্রিক মানবিক কল্যাণের জন্য যদি তাদের আমরা কাজে লাগাতে পারি তাহলে দেশ এবং জাতি উপকৃত হবে। তারা অনেক বেশি প্রতিভাবান ও বিবেকবান এটা বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখন দেশে সংস্কারের প্রবাহ চলছে, তাই প্রথমে আমাদের নিজেদেরসংস্কার করতে হবে; আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক কিছু করার আছে। আমরা দেখি ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের রিলস বা কনটেন্ট তৈরি করা হয়; সেখানে যদি আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সচেতনতামূলক কনটেন্ট তৈরি করি তাহলে মানুষ অনেক সচেতন হয়ে যাবে। এছাড়াও দেশের সকল ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো প্রতিদিন দুই থেকে তিন মিনিট প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারে।”
তিনি দেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সামনে নির্বাচন তাই প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অগ্রাধিকার থাকা উচিত।”
আব্দুল কাদের বলেন, “আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রাম-গঞ্জে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এখনও অনেক ছোট করে দেখা হয়। সমাজে এখনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য প্রথমেই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক দিক দিয়েই আমাদের চেয়ে এগিয়ে। এমন অনেক কাজ আছে; যেগুলো হয়তো আমরা করতে পারি না, কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী মানুষ করতে পারে।”
প্যানেল আলোচনায় মুহাম্মদ হিরুজ্জামান বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখন অনেক অগ্রসর হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা আমাদেরও ছাড়িয়ে গেছে। সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে আমি যখন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক ছিলাম তখন আমার জায়গা থেকে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি।”
একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বন্ধুর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যারা একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি তাদের মধ্যে আমার ওই দৃষ্টির প্রতিবন্ধী বন্ধু সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে।”
প্যানেল আলোচনায় ইমরান হোসেন বলেন, “আমি যখন বিদেশে পড়াশোনার সময় দেখেছি একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তারা কীভাবে সহযোগিতা করে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এমনটা চিন্তাই করা যায় না।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা মানুষকে সঠিক বার্তা না দিয়ে ভুল বার্তা দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতির উন্নতির জন্য শুধুমাত্র সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যারা স্টেকহোল্ডার আছে তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।”
মঞ্জুর রশিদ বলেন, “আমাদের দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সাহসিকতা ও ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বিভিন্নভাবে তাৎপর্যশীল ভূমিকা রাখছে।”
তিনি বলেন, “আসলে সীমাবদ্ধতা তাদের নয়; সীমাবদ্ধতা আমাদের। আমরা কি ইনক্লুসিভ এডুকেশন নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমাদের এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়া উচিত ইনক্লুসিভ এডুকেশন নিয়ে।”
ভাস্কর ভট্টাচার্যী বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখন কম্পিউটার চালাতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে তাই আমরা এখন টেকনোলজি ব্যবহার করে সব ধরনের কাজ করতে পারছি। তবে বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য এখনও অনেক ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি বেসরকারি অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে যা আমরা এখনও এক্সেস করতে পারিনা “
তিনি বাংলাদেশের ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি গাইড মেনে সব ওয়েবসাইট তৈরি করার সুপারিশ তুলে ধরেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে সবার প্রতি বেশি বেশি লেখালিখর আহ্বান জনান সেমিনারের সংঞ্চালক রিয়াজ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর তৈরি “গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী সমতা”শীর্ষক ব্যবহারিক নির্দেশিকার মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। নির্দেশিকার বাংলা রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী এ সময় বক্তৃতা রাখেন।
অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিকা পরিবেশনার পাশাপাশি রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।