টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে সাবেক কাউন্সিলর সালেহা বেগমের বাড়িতে অভিযানের নামে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ লুটের অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কয়েকজন সদস্যদের বিরুদ্ধে। অভিযানের পর ১০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার দেখিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু আব্দুল্লাহ খানের সঙ্গে জব্দ করা মাদকসহ ফটোসেশন করেন টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা।
বিষয়টি নিয়ে গত ২ জুলাই ভুক্তভোগী সালেহা বেগম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে ও থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
এ ঘটনায় আতঙ্কে দিন যাপন করছেন সালেহার পরিবারের লোকজন। ঘটনার দোষীদের শাস্তি এবং লুট হওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করেছেন। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা যায়, গত ১৮ জুন সকালে উপজেলার বাহাদিপুর গ্রামের সাবেক কাউন্সিলর সালেহা বেগমের বাড়িতে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম, সহকারী উপ-পরিদর্শক শামীম আল আজাদ, জিয়াউর রহমানসহ প্রায় আটজন অভিযান চালান। ঘর তল্লাশির নামে আলমারি, শোকেস ও ড্রয়ার খুলে ছালেহা ও তার ছেলের জমানো নগদ ৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা নিয়ে যান তারা। প্রায় ৩ ঘণ্টার অধিক সময় অভিযানের পর ১০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার দেখানো হয়।
পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে মিথ্যা জবানবন্দি ভিডিও করে নিয়ে যান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তররের সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রশাসনকে না জানিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করেছেন। এরপর ভূঞাপুর থানায় সালেহা বেগমের ছেলেকে রনিকে পলাতক দেখিয়ে একটি মামলা করে টাঙ্গাইল জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এজাহারে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলা হয়। তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তররের সদস্যরাই মাদক উদ্ধার করেন এবং পরে তাকে অবগত করা হয়।
সরেজমিনে সাবেক কাউন্সিলর সালেহা বেগম বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এখনও পরিবারের সদস্যদের আতঙ্ক কাটেনি। স্থানীয় লোকজন তাদের সমবেদনা জানাতে আসছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আগামী বছর হজে যাওয়ার জন্য টাকাগুলো রাখা হয়েছিল। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নারী সদস্য ছাড়াই এসে বাড়ির নারী সদস্যের নির্যাতন করা হয়। এলাকার কোনো লোকজনকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী সাবেক কাউন্সিলর সালেহা বেগম অভিযোগ করে বলেন, “প্রথমে তারা কোনো কিছু না পেয়ে চলে যান। পরে ফিরে এসে গাড়ির তেল খরচের জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়াতে তারা ক্ষিপ্ত হন। পরে তারা আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা ও গহনা নিয়ে অন্য রুমে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে আমাকে গহনা ফেরত দিলেও টাকা ফেরত হয়নি। পরে তারা ফেনসিডিল উদ্ধারের নাটক করেন। আমাদের অনেককে নির্যাতন করা হয়েছে। পরবর্তীতে জোরপূর্বক মিথ্যা জবানবন্দি ভিডিও করে নিয়ে যায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। এ ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু বিচারের দাবি করছি। “
তিনি আরও বলেন, “টাকা ফেরত চাইলে আমাকে নির্যাতন করা হয়। এছাড়া থানায় মামলা করার ও আমাকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আমি হাত-পা ধরে অনুরোধ করলেও তারা টাকা দেননি।”
সালেহা বেগমের স্বামী বলেন, “আমাকে জোর করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন বাড়ি থেকে বের দেন। পরে এসে দেখি ঘরের জিনিসপত্র তখনছ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়ে গেছে বলে জানতে পারি। মুরগির খামার ও গরু বিক্রির টাকা বাড়িতে রাখা ছিল। হজে যাওয়ার জন্য টাকাগুলো জমিয়ে রাখা হয়েছিল। আমি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি করছি।”
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবু আব্দুল্লাহ খান বলেন, “অভিযানের আগে আমাকে কোনো কিছুই জানানো হয়নি। অভিযানের নামে টাকা নেওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী সালেহা বেগমের দেওয়া একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি আমলে নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযানে থাকা সহকারী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক শামীম আল আজাদ এ ব্যাপারে কোনো কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি পরিদর্শক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ভারপ্রাপ্ত) পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে আগেই অবগত করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।
এ ব্যপারে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুক্তভোগী ওই নারী সুষ্ঠু বিচার পাবেন। উপ-পরিদর্শক শামীম আল আজাদকে বদলির জন্য হেডকোয়ার্টারে আবেদন করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শামীম আল আজাদকে টাঙ্গাইল আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্ত তিনি সেখানে যোগদান না করে আদেশ অমান্য করেছেন।”