পুরান ঢাকায় নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বিক্ষোভ

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) হাসপাতালের সামনে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ও পাথর মেরে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদ এবং সারাদেশে অব্যাহত চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার (১১ জুলাই) রাত ৯টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও প্রায় একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি), মাওলানা ভাসানি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ মিছিলটি শহিদ মিনার থেকে শুরু হয়ে রায় সাহেব বাজার, তাঁতিবাজার, নয়াবাজার ও মিডফোর্ড হাসপাতাল ঘুরে ক্যাম্পাসের ভাষা শহিদ রফিক ভবনের নিচে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মিছিলে কয়েকশ’ শিক্ষার্থী অংশ নেন।

সমাবেশে চাঁদা না দেওয়ায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে পাথর দিয়ে নৃসংসভাবে হত্যাসহ সারাদেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা।

এ সময় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জবি শাখার আহ্বায়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর আমরা চেয়েছিলাম সাম্যের ও শান্তিপূর্ণ একটি বাংলাদেশ, চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ। কিন্তু হাসিনা যাওয়ার দিন বিকাল থেকেই একটা দল চাঁদাবাজি শুরু করেছে। শহিদ আবু সাঈদ, শহিদ ওয়াসিম, শহিদ সাজিদের ভাইয়েরা মারা যায়নি। প্রয়োজনে আবার জুলাই হবে।’’

বাংলাদেশ গনতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শশিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. নূর নবী বলেন, ‘‘এই পাথরটা আমার ভাইয়ের ওপরে নয়, মনে হয় আমার বুকের ওপর পড়ে। এই ক্যাম্পাসে যেমন ছাত্রলীগ বিশ্বজিৎকে হত্যা করেছে, ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি মিলফোর্ডে ঘটেছে। ১০ মাস না যেতেই আপনারা আপনাদের দলের লোকদেরই হত্যা করছেন। হাসিনার দায়িত্ব আপনাদের ওপর দিয়ে যায়নি। ৫ আগস্টে ফ্যাসিস্টকে যেভাবে প্রতিহত করেছি, তাদেরও প্রতিহত করতে বাধ্য হব।’’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রায়হান হাসান রাব্বি বলেন, ‘‘জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছরও পূরণ হয়নি। এরই মধ্যে চাঁদা না দেওয়ায় জনসম্মুখে পাথর দিয়ে মানুষ খুন করার মতো ঘটনা ঘটছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা মনে করি যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত, তারা জুলাইকে ধারণ করতে পারে না। যদি বিএনপি এই ঘটনার বিচার না করে, তবে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি নিয়েও আমরা প্রশ্ন তুলব। আর ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তীকালীন) সরকার জনগণের ম্যানডেট নিয়ে বসেছে, কোনো দলের ম্যানডেট নয়। আমরা এর বিচার চাই।’’

অন্যদিকে, গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় ‘‘সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য’’ ব্যানারে একটি মিছিল শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে আগের স্থানে ফিরে এসে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

‎এ সময় গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব লাবিব আহসানের সঞ্চালনায় বক্তারা বলেন, ‘‘৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে বর্বরতার সীমা লঙ্ঘন করেছিল, এখন ঠিক একই কায়দায় বিএনপি করছে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের শুধু হাত বদল হয়েছে। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সহযোগী বিএনপি ছাত্র-জনতার সঙ্গে প্রতারণা করে জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।‎’’

সমাবেশে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ জাবি শাখার আহবায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটাচ্ছে। তারা দেশকে একটা সন্ত্রাসের রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। আমরা তাদের হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, আপনারা যদি জালিম হয়ে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আমরাও তখন জুলাই হয়ে আপনাদের প্রতিরোধ করব।’’

জাবিতে সক্রিয় গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, ‘‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। আমরা দেখেছি, বিএনপির মতো একটি দল যারা এখনো ক্ষমতায় যায়নি, অথচ আগেই রাবণের রূপ ধারণ করেছে। ঢাকায় যুবদলের নেতা-কর্মীরা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে চাঁদা না দেওয়ার কারণে জাহেলিয়াতের যুগের মতো নৃশংসভাবে খুন করেছে।”

এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শাহপরান হল থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু হলে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে মিছিলটি সমাপ্ত হয়।

এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাখা সদস্যসচিব  হাফিজুল ইসলাম বলেন, “সম্প্রতি রাজধানীর মিটফোর্ডে চাঁদার দাবিতে যুবদল নেতা কর্তৃক এক ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অব্যাহত চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আমরা শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ দিনের পর দিন অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে।’’

এদিকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানি বিজ্ঞাও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্নান হলের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে সোহাগ নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও ভাইরাল হলে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।