গোপালগঞ্জে কারফিউয়ের মধ্যে সারাদিন যা ঘটলো

গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রা ঘিরে গতকাল বুধবার দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হামলাকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে চারজন নিহত, অন্তত নয়জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনার পর জেলায় কারফিউয়ের মধ্যে যৌথ বাহিনী ২৪ জনকে আটক করেছে। তবে এখনও কোনো মামলা হয়নি।

বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জানান, আগামীকাল শুক্রবার (১৮ জুলাই) বেলা ১১টা পর্যন্ত কারফিউ বাড়ানো হয়েছে। ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টা কারফিউ শিথিল থাকবে। পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সরাদিনের কারফিউয়ের চিত্র      

গোপালগঞ্জে বৃহস্পতিবার সারাদিন কারফিউ বলবৎ ছিল। সকাল থেকেই রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমিত আকারে রিকশা ও ইজিবাইক চলতে দেখা যায়। দোকানপাট বন্ধ ছিল। তবে জরুরি সেবা চালু ছিল। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বাইরে বের হয়নি।  সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে পুলিশ ও এপিবিএন মোতয়েন করা হয়। সারাদিন সেনা সদস্যরা সাঁজোয়া যান নিয়ে শহরে টহল দিয়েছেন। শহরের ব্যস্ততম এলাকায় কোনো কোলাহল ছিল না। মানুষের মধ্যে চাপা আতংক বিরাজ করছিল।

২৪ জন আটক

এদিকে, কারফিউয়ের মধ্যে গোপালগঞ্জে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ২৪ জনকে আটক করেছে। এরমধ্যে ১৪ জনকে গত রাতে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবার সারাদিনে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ১০ জন আটক হন। গোপালগঞ্জে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান ২৪ জনকে আটকের তথ্য নিশ্চিত করে জানান, বুধবারের ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি।

আত্মগোপনে

আটক অভিযান শুরুর পর থেকেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা চলে যান গোপন স্থানে। আটক নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অজানা আতংক দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোপালগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, নির্বিচারে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের গ্রেপ্তার করছে। বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া নেতা-কর্মীদের নির্যাতন করা হচ্ছে। এ কারণে আমরা আত্মগোপনে রয়েছি।

জেলা কারাগার পরিদর্শন

গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা ও সভাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা কারাগার পরিদর্শন করেছেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল তানভীর হোসেন। তিনি বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে এসে পৌঁছান।

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল তানভীর সংবাদমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় কারাগারে হামলার ঘটনা সামাল দিতে পেরেছি। এজন্য আমি সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই। কারাগারে ফের হামলার কোনো আশঙ্কা নেই। তারপরেও সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কারারক্ষীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।”

গতকাল বুধবার এনসিপির পদযাত্রা ও সভাকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার পর বিকেলে হামলা করা হয় গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে। সেখানে ভাঙচুর করে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কারারক্ষীরা সারারাত জেলা কারাগারের সামনে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

তদন্ত কমিটি

গোপালগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। এর প্রধান করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গণিকে। কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন, জনপ্রশাসন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দুজন অতিরিক্ত সচিব।

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন

গোপালগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার পর কারফিউ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি আরও জানান, গোপালগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।

শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “গতকাল এনসিপির পথসভাকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। সে প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকালই কারফিউ জারি করা হয়েছে। যা এখনও রয়েছে। আমরা বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে গোপালগঞ্জের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। যে পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছিল, তা এখন সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। সার্বিকভাবে যাতে আর পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে এজন্য কারফিউ কন্টিনিউ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল ১১টা পর্যন্ত কারফিউ বাড়ানো হয়েছে। এরপর ৩ ঘন্টা বিরতি দিয়ে দুপুর ২টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ পুনরায় চলবে। আগামীকাল (শুক্রবার) পর্যালোচনা করে যদি পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ করা যায় তখন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “বুধবার চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৪০-৫০ সদস্য জন আহত হয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত ২৪ জন দুষ্কৃতিকারীকে আটক করা হয়েছে।”

এ হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান বিভাগীয় কমিশনার।

ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজির ব্রিফিং

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে কিছু দুষ্কৃতিকারী জেলার বাহির থেকে এসেছিল। তারা এখনও গোপালগঞ্জে অবস্থান করছে, এমন গোয়েন্দা তথ্য আমাদের কাছে আছে। আমরা তাদেরকে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মনে হবে না যে, পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এটা অব্যাহত রাখব।”

এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত ২৪ জনের অধিক গ্রেপ্তার হয়েছে। যারা দুষ্কৃতিকারী, যারা বুধবারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে জড়িত তাদেরকে আমরা অবশ্যই আইনের আওতায় আনব এবং সে প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।”

নিহত চারজনের ময়নাতদন্ত না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, “বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হবে।”

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল মাবুদ, গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস এম তারেক সুলতান।