বাজেট কী? আয়-ব্যয়ের হিসাব ছাড়াও যা জানা জরুরি

আমরা প্রতিদিন বাজারে গিয়ে হিসাব করি - পকেটে কত টাকা আছে আর কী কী কিনতে হবে। সাধারণ মানুষের এই হিসাবটা সহজ; আগে আয়, তারপর ব্যয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের হিসাবটা ঠিক উল্টো। রাষ্ট্র বা সরকার আগে ঠিক করে আগামী এক বছরে দেশের উন্নয়নে কত খরচ হবে, তারপর খোঁজা শুরু করে সেই খরচের টাকা আসবে কোথা থেকে! রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের এই বিশাল ও জটিল হিসাব-নিকাশের নামই হলো ‘বাজেট’।

কিন্তু আমরা কি জানি, আজকের এই ট্রিলিয়ন টাকার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পেছনে কোন গল্প লুকিয়ে আছে?

বাজেট শব্দটি কোথায় থেকে এসেছে 

‘বাজেট’ শব্দটির জন্ম কিন্তু কোনো অর্থনীতিবিদের টেবিলে হয়নি। এর সূত্রপাত প্রাচীন ফরাসি শব্দ ‘বুজেট’ (Bougette) থেকে, যার অর্থ ছিল ছোট চামড়ার থলি বা টাকা রাখার ব্যাগ। মধ্যযুগে শব্দটি ফরাসি থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, প্রাচীন ব্রিটেনে অর্থমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপুল যখন দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব পেশ করতে সংসদে যেতেন, তখন সব নথিপত্র একটি চামড়ার ব্যাগে ভরে নিয়ে যেতেন। পরে সেই ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে পার্লামেন্টে আর্থিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন। এই হচ্ছে বাজেটের শুরু। সংসদে গিয়ে সবার সামনে তিনি যখন ব্যাগটি খুলতেন, তখন সংসদ সদস্যরা মজা করে বলতেন - ‘ওপেনিং দ্য বাজেট’ বা ‘বাজেট উন্মোচন’। কালের বিবর্তনে সেই চামড়ার ব্যাগটি হারিয়ে গেলেও, ব্যাগের ভেতরের ‘আর্থিক পরিকল্পনাটি’ স্থায়ীভাবে ‘বাজেট’ নামে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি পেয়ে যায়।

একটি দেশের ‘অর্থনৈতিক রোডম্যাপ’

সহজ কথায়, বাজেট হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক রোডম্যাপ। একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে সরকার কোন কোন খাত থেকে টাকা আয় করবে এবং সেই টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা যোগাযোগ খাতের মতো কোন কোন জায়গায় খরচ করবে, তার একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দলিল হলো এই বাজেট।

একটি বিশাল রাষ্ট্র চালাতে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তার সিংহভাগই আসে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে, যার নাম ‘রাজস্ব’ বা ট্যাক্স।

ভ্যাট ও আয়কর: আমরা যখন একটা পণ্য কিনি, রেস্তোরাঁয় খাই কিংবা মোবাইলে রিচার্জ করি, তখন অজান্তেই সরকারের কোষাগারে ‘ভ্যাট’ বা মূল্য সংযোজন কর জমা দিয়ে দিই। আবার নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় করলে নাগরিকদের দিতে হয় ‘আয়কর’।

এছাড়া বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাভ, লাইসেন্স বা সেবার ফি এবং বিদেশি অনুদান থেকেও সরকার আয় করে থাকে।

টাকা খরচ হয় যেখানে

সরকারের খরচ মূলত দুই ধরনের -

পরিচালন ব্যয়: যা সরকারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মতো। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অফিস খরচ ও প্রশাসনিক কাজ চালাতে এই টাকা ব্যয় হয়।

উন্নয়ন ব্যয়: দেশের রাস্তাঘাট, পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট, নতুন হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে যে অর্থ খরচ হয়, তা-ই উন্নয়ন ব্যয়। এই উন্নয়নমূলক কাজের বার্ষিক পরিকল্পনাকে বলা হয় ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’ বা এডিপি (ADP)।

আয়-ব্যয়ের অমিল: ঘাটতি বাজেট

সংসারের মতো রাষ্ট্রেও অনেক সময় আয়ের চেয়ে ব্যয়ের খাতা বড় হয়ে যায়। একে বলা হয়‘ঘাটতি বাজেট’। এই বাড়তি খরচের টাকা জোগাড় করতে সরকার তখন দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে টাকা তোলে কিংবা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ করে।

বাজেট আলোচনায় ব্যবহৃত কিছু পরিচিত শব্দ 

বাজেট ঘোষণার পর কিছু শব্দ প্রায়ই আলোচনায় আসে - 

ভর্তুকি: সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সরকার যখন কোনো পণ্যের দামের একটা বড় অংশ নিজে পরিশোধ করে। যেমন - কৃষকদের জন্য কম দামে সার নিশ্চিত করতে সরকার শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়।

সামাজিক নিরাপত্তা খাত: সমাজের পিছিয়ে পড়া, প্রবীণ বা বিধবাদের জন্য দেওয়া সরকারি ভাতা। 

মূল্যস্ফীতি: বাজেটের কর কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া।

উৎস কর: আয় বা লেনদেনের সময় সরাসরি কেটে রাখা করকে উৎস কর বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার আগেই নির্ধারিত কর কেটে রাখা হয়।

আবগারি শুল্ক: দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত বা নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবার ওপর আরোপিত করকে আবগারি শুল্ক বলা হয়। এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

দিনশেষে, একটি বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার যোগ-বিয়োগ নয়; এটি একটি দেশের কোটি কোটি মানুষের আগামী এক বছরের জীবনযাত্রার মান কেমন হবে, তার প্রতিচ্ছবি। চামড়ার থলি থেকে শুরু হওয়া এই ধারণাটি আজ একটি রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।