জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের নতুন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বেলা ৩টার দিকে তিনি এই বাজেট পেশ করা শুরু করেন। বর্তমান বিএনপি সরকারের এই মেয়াদের এটিই প্রথম বাজেট।
নতুন এই বাজেটে দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের সুবিধার্থে অসংখ্য পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ককর ছাড় দেওয়ার বড় ঘোষণা এসেছে। আবার একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়াতে কিছু কিছু পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ককর বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে। সংসদের নিয়ম অনুযায়ী, বাজেটের শুল্ককর সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই (আজ থেকেই) বাজারে কার্যকর হয়ে যায়। তবে সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বাজেটে শুল্ককর বাড়ানোর চেয়ে কমানোর পণ্যসংখ্যাই অনেক বেশি।
যেসব পণ্যের দাম কমছে
১. ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য:
বিগত বছরগুলোর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ মোট ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার আগে থাকা ৫, ২ কিংবা ১ % থেকে একলাফে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ (০.৫)% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
২. ল্যাপটপ ও কম্পিউটার সামগ্রী:
প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় সুখবর এনে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমুদয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দেশে কম্পিউটার সামগ্রীর দাম ব্যাপকভাবে কমবে।
৩. শিশুখাদ্য, খেজুর ও মসলা:
বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমাতে এর উৎপাদন সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে। এছাড়া রমজান ও সাধারণ ক্রেতাদের সুবিধার্থে খেজুর আমদানির ৫ % নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়ার ওপর থাকা ৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।
৪. কিডনি ডায়ালাইসিস ও ক্যানসারের ওষুধ:
স্বাস্থ্য খাতে বড় স্বস্তি দিয়ে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ১৫ % ভ্যাট ও ৫% অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে কিডনি রোগীদের প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যয় প্রায় ৮ টাকা পর্যন্ত কমবে। এছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামালসহ অন্যান্য সাধারণ ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বড় শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে।
৫. বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সোনার গয়না:
পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) দাম কমাতে এর করভার ৯৩% থেকে কমিয়ে মূল্যভেদে ৬৪ ও ৮০% নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইভি চার্জিং স্টেশনের ব্যাটারি ও সরঞ্জামেও বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সোনা সরবরাহে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% এবং ভ্যাট কমিয়ে ভরিপ্রতি মাত্র আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করায় সোনার গয়নার দাম কমবে।
৬. অন্যান্য:
শুল্ক কমানোর ফলে বাদ্যযন্ত্র (গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন), সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টর, বিদেশী মাংস, প্রাণিখাদ্য, পিওস যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, লিপস্টিক ও ফেসওয়াশের দাম কমতে পারে।
যেসব পণ্যের দাম বাড়ছে
১. সিগারেট ও নিকোটিনজাত পণ্য:
সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তর ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে ধূমপায়ীদের খরচ বাড়ছে।
২. তেলচালিত গাড়ি:
পরিবেশের সুরক্ষায় ডিজেল, অকটেন বা পেট্রলচালিত গাড়ি নিরুৎসাহিত করতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসির ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনবিশিষ্ট আমদানি করা গাড়ির ওপর করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ % থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬% করা হয়েছে।
৩. নির্মাণসামগ্রী (রড):
আবাসন খাতের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, রড তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল ও উপকরণের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে রডের দাম বাড়তে পারে।
৪. বিদেশি কাজুবাদাম ও পাঙাশের ফিলে:
দেশীয় চাষ ও মৎস্য শিল্পকে সুরক্ষা দিতে প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত বিদেশী কাজুবাদাম আমদানিতে ২৫% পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া আমদানি করা বিদেশী পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর নতুন করে ২০% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
৫. অন্যান্য আমদানিকৃত পণ্য:
আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও শুল্কায়নের ন্যূনতম মূল্য বাড়ানোর কারণে বিদেশী গ্যাস সিলিন্ডার (কম্পোজিট এলপিজি), বিদেশী মধু (ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য প্রতি ইউনিট ২ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭ ডলার), বিদেশী সুপারি, কফি, তৈরি খাবার, সুগার কনফেকশনারি, লিপ লাইনার, লিপ জেল, বিদেশী টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, বিদেশী ফোম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সাইকেল ও খেলনার দাম বাড়তে পারে।