প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও ২০ অক্টোবর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) দিবস। ১৯ পেরিয়ে ২০ এ পদার্পণ করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
তবে এত বছর পার করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও শিক্ষাগত উন্নয়নের কোনো ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি। কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপিত হওয়ার জন্য বারবার বাজেট পাস হলেও নানা উত্থান-পতন ও জালিয়াতির মধ্য দিয়ে তা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। তাছাড়া বর্তমানে সদরঘাটে জবির যে ক্যাম্পাস আছে সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দিনের পর দিন আরও সমস্যা বেড়েই চলেছে ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো:
গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটে স্বল্পতা, হলে সিট স্বল্পতা, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের ধীরগতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব টিএসসি না থাকা, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি ক্যাফেটেরিয়া, অনুন্নত ও ভারসাম্যহীন মেডিক্যাল সেন্টার, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নেই পর্যাপ্ত বাস সুবিধা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট ৩৮টি বিভাগ থাকলেও কোনো বিভাগেই নেই পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্লাসরুম। এক ব্যাচের ক্লাস চলাকালীন অপর ব্যাচগুলোকে বাইরে দাড়িয়ে থাকতে হয়। আবার শ্রেণিকক্ষ এমন যে সেখানে বসার জায়গা থাকে না। বিভাগীয় কমনরুমও নেই ছাত্রীদের। দু-একটি বিভাগে কমনরুম থাকলেও তাতে রয়েছে চেয়ার-টেবিলের স্বল্পতা। পরীক্ষা চলাকালীন অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে পারেন না। প্রায় সব বিভাগের এ অবস্থা।
লাইব্রেরি বা বিভাগীয় সেমিনারে রয়েছে পর্যাপ্ত বইয়ের স্বল্পতা। শিক্ষার্থীরা বই বাসায়ও নিয়ে যেতে পারেন না। এছাড়াও বই নিয়ে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করা যায় না। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে কোনো বিষয়েরই পর্যাপ্ত বই নেই। সেমিনার আছে তো বই নেই। কয়েকটিতে থাকলেও অপর্যাপ্ত। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে ফটোকপি করার কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শরিফা আক্তার সোমা বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন তো হয়নি, বরং আরও এত বছর পার করেও অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের কোনো গতিই আমাদের চোখে পড়ে না। ফলে আমরা বর্তমান ক্যাম্পাসে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। কারণ আমাদের ক্যাম্পাস প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট। বিভাগের সংখ্যা অনেক থাকলেও নেই পর্যাপ্ত ক্লাসরুম। ফলে অনেক সময় ক্লাস করার জন্য শ্রেণীকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার কিছু কিছু বিভাগে শিক্ষকের সংখ্যা এত কম যে বিভাগগুলোতে সেশন জট শুরু হয়ে গেছে।”
সমাজকর্ম বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মায়িশা ফাহমিদা ইসলাম বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু একটি স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সেক্ষেত্রে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর গবেষণার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত গবেষণার পরিবেশ ও ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী গবেষণার জন্য বেছে নিচ্ছেন দেশ ও বিদেশে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। এছাড়াও কলাভবনে দুটি রিডিং রুম হিসেবে বরাদ্দ রাখলেও প্রায়শই বিভিন্ন বিভাগের ক্লাসও পরীক্ষা নেওয়া হয় সেখানে। এতে করে সেখানে পড়তে আসা বিভিন্ন প্রাক্তন কিংবা অধ্যয়নত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। এছাড়া রিডিং রুমে নেই কোন বইয়ের সংগ্রহশালা। লাইব্রেরিতে বই সংগ্রহে রয়েছে অনেক দুর্বলতা।”
এ বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাইসুল ইসলাম বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ বছর পরও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতা, মেয়েদের জন্য আলাদা কমন রুম, ওয়াশরুমের অভাব, এবং শুধুমাত্র একটি ক্যাফেটেরিয়ার মতো সমস্যাগুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করছে। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে শিক্ষার মান উন্নত করতে হয়, সেখানে মৌলিক অবকাঠামোর অভাব অগ্রগতির পথে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সমস্যা সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত উন্নয়ন কৌশল। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও তাদের প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। শুধুমাত্র একটি ক্যাফেটেরিয়ার উপর নির্ভর করা শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ তৈরি করে, তাই নতুন ক্যাফেটেরিয়া স্থাপন করে বিভিন্ন খাবারের বিকল্প ও আরও সেবা নিশ্চিত করতে হবে।”