‘আমরা কি মনে রাখছি, আব্বা-আম্মা কী করছে আমাদের জন্য?’

নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী মানেই যে সমাজে ঘটমান বিষয়কে অসাধারণ নিপুণতায় পর্দায় তুলে ধরা; সেটি নতুন করে বলার কিছু নেই। এর আগেও তিনি বহুবার সমাজের সাধারণ ঘটনাকে পর্দায় তুলে ধরে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন নানা অসঙ্গতি। এবারও তার ব্যতয় ঘটল না। সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম “চরকি”তে মুক্তি পেয়েছে ফারুকী’র ওয়েবফিল্ম “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি”। সেখানেও তিনি দেখিয়ে দিলেন সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক মনোবৃত্তি আর বৈষম্য।

তবে আগের যেকোনো নির্মাণের চেয়ে এবার পার্থক্য গড়ে দিয়েছে পর্দার পেছন থেকে প্রথমবারের মতো ফারুকীর সামনে আসা। তিশার মতো গুণী অভিনেত্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করলেন অভিনয়।

নাম শুনেই মিডিয়া পাড়ায় আগেই গুঞ্জন উঠেছিল যে “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি” ফারুকী-তিশা দম্পতির বাস্তব জীবনের গল্প। তবে এ বিষয়ে তারা সরাসরি কিছু না বললেও গল্পে যে তাদের জীবনের প্রতিফলন রয়েছে সেটি বোঝার জন্য খুব বেশি মাথা খাটাতে হবে না। বাস্তব জীবনের গল্পের সঙ্গে রয়েছে চিন্তার মিশেল। সবমিলে “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি” ফারুকীর এক অনবদ্য সৃষ্টি। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন আমাদের প্রত্যেকের জীবনের পরিচিত কিছু ঘটনা; যা চরম বৈষম্যের।

এই যেমন, কোনো দম্পতি কেন বিয়ের পর সন্তান নিচ্ছেন না; তা নিয়ে সমাজের নানাজনের নানা জিজ্ঞাসা, সন্তানের গায়ের রং নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এমনকি সেলিব্রেটি হয়েও নিস্তার নেয় এমন বৈষম্য আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বেড়াজাল এড়ানোর। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর সন্তান না থাকলে ঘরে ফেরেশতা আসে না কিংবা ঘরে পুতুল থাকলে ফেরেশতা আসবে না; সমাজের এমন বদ্ধমূল ধারণাগুলোও তুলে ধরেছেন নির্মাতা।

সঙ্গে দেখিয়েছেন রাষ্ট্র ও সমাজের চাপিয়ে দেওয়া “সিস্টেমের” যাঁতাকলে পিষ্ট জীবনযাপনকে। যেখানে নেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের জন্যেও যেখানে দিতে হয় চরম মূল্য।   

ফারহান ও তিথি নামের দুই দম্পতির জীবনের একটি ছোট্ট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আবর্তে উঠে এসেছে আমাদের জীবনের আরও কিছু রূঢ় বাস্তবতা, যেগুলো নিয়ে সাধারণত আমরা খুব একটা উদ্বিগ্ন নই। এই যেমন, সন্তানসম্ভবা নারীদের জন্য শব্দদূষণ কতটা ক্ষতির হতে পারে সেটিও তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে।

আর সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের আত্মত্যাগের উদাহরণগুলো। সেই সঙ্গে “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি”র কিছু কিছু ডায়লগ দর্শকদের মস্তিষ্কে জন্ম দিয়েছে প্রশ্নের, ভাবতে বাধ্য করেছে তাদের।

গল্পের প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, তিথি থাইল্যান্ডের পাতায়ায় শুটিংয়ের ফাঁকে প্যারাগ্লাইডিং উপভোগ করছে। ঢাকা থেকে তার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছে ফারহান। কথোপকথনের একপযার্য়ে তিথি মনের অনুভূতি জানাতে বলে ওঠে, “জীবনে অর্থ নয়, খ্যাতি নয়; সে চেয়েছে দুটি পাখা”।

আর এই ছোট্ট সংলাপটিই যেন বুঝিয়ে দিয়েছে আমাদের সমাজে নানা সংস্কারে মেয়েদের বেঁধে ফেলার প্রবণতার বিপরীতে তাদের শেকল ভাঙার ব্যকুলতা।

গল্পের পরের দৃশ্যে পাতায়ায় ছিনতাইয়ের শিকার হয় তিথি। প্রবাসীদের সহায়তায় ব্যাগ ফেরত পায় সে। কিন্তু সেখানেও এক প্রবাসী তাকে প্রশ্ন তোলেন, “বিয়ে করেছেন ১০ বছর হলো, বাচ্চা নেবেন কবে?”

ঘটনার পরিক্রমায় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিথি-ফারহান। নানা রকম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে সন্তানের আগমনের আনন্দের পাশাপাশি এই ধাপে ফারুকী মিশিয়ে দিয়েছেন আমাদের ক্ষমতার আধিপত্য।

গর্ভবতী স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ফারহান শব্দদূষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন, মিথ্যা মামলায় তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র অনাগত সন্তানের কথা ভেবে নিজের অহম, আত্মসম্মান, নীতি, আদর্শ ও চিন্তার বিপরীতে গিয়ে ফারহান নতি স্বীকার করে অন্যায়ের কাছে। যেখানে বুক ভাঙা কষ্ট নিয়ে ফারহানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, “আমরা কি মনে রাখছি, আব্বা-আম্মা কী করছে আমাদের জন্য?” আর এই প্রশ্নটিই আঘাত করে গেছে প্রতিটি দর্শকের চিন্তায়। ভাবতে বাধ্য করেছে, আমরা কি আসলেই আমাদের বাবা-মায়ের আত্মত্যাগের কথা মনে রাখি।

গল্পের জায়গা থেকে আহামরি নতুনত্ব কিছু নেই “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি”তে। তবে উপস্থাপনের নান্দনিকতায় ফারুকীর ক্যারিয়ারে যে এটি অনবদ্য একটি সৃষ্টি তা সবচেয়ে কঠোর সমালোচকও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।

অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, আবহসঙ্গীত সবমিলিয়ে পরিপূর্ণ একটি উপস্থাপন “সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি”।

নুসরাত ইমরোজ তিশার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই, বরং এই প্রশ্ন করা যেতে পারে যে; তিথি চরিত্রে তিশার চেয়ে আর ভালো কেউ কি আদৌ হতে পারত? একই অবস্থা অভিনেতা ফারুকীর বেলায়ও। প্রথমবার পর্দায়, তাও আবার এমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। কিন্তু একবারও দেখে মনে হয়নি তিনি অভিনয় করছেন। বারবারই মনে হয়েছে এ যেন সত্যিকারের ফারহান, এই চরিত্রের জন্য ফারুকীর চেয়ে আর কেউ নিখুঁত হতে পারত না।

“সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি”তে আলাদা করে নজর করেছেন বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা ডিপজল। নিজের চিরায়ত ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক ধাঁচে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন তিনি। পাশাপাশি ডলি জহুর, ইরেশ জাকের, শরাফ আহমেদ জীবন, রিফাত মজুমদার,সহ প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে সুনিপুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।

আলাদা করে নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন চিত্রগ্রাহক তাহসিন রহমান। শেষ দিকে পাভেল আরীনের আবহ সংগীত অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করেছে।