আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এরকম যে, নারীর “না” মানে “হ্যাঁ”। তবে বারবারই এর বিপক্ষে প্রতিবাদ উঠেছে। বলা হয়েছে নারীর “না” মানে “না”। আর সেটি যদি হয় ধর্ষণের মতো বিষয়, তাহলে তো কোনোভাবেই নারীর “না” কে “হ্যাঁ” বলে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তারপরও খুব একটা বদলায়নি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। কোথাও না কোথাও ধর্ষণের জন্য উদ্দীপক হিসেবে নারীর পোশাক কিংবা চালচলনকে দায়ী করার চেষ্টা চলে। এমনকি অনেক্ষেত্রে পরিবারও চায় ধর্ষণের ঘটনা লুকিয়ে রাখতে, পরিবার থেকেও দোষারোপ করা হয় ভুক্তভোগীকে। তরুণ কিংবা বয়স্ক প্রতেবেশী কারো কাছ থেকেই যেন রেহাই নেই নারীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি। এর সবটাই আমাদের চারপাশের পরিচিত ঘটনা। তবে সেই পরিচিত ঘটনাই পর্দায় আলাদাভাবে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল।
সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই’য়ে মুক্তি পেয়েছে এই নির্মাতার পাঁচ পর্বের ওয়েব সিরিজ “মোবারকনামা”। যেখানে ধর্ষণের ভুক্তভোগী এক নারীর আইনের আশ্রয় নেওয়া এবং ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে মরিয়া একজন আইনজীবীর গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
গল্পে দেখানো হয়েছে, পেশাগত জীবনে আইনজীবী মোবারক সততার সঙ্গে সত্যের পক্ষে লড়াই করে গেছেন। কিন্তু একটি মামলায় জয়ী হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে ওই মামলার আসামি নির্দোষ ছিল। বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না মোবারক। এ কারণে তিনি তার পেশা থেকে সরে যান। আর বিষয়টি তাকে ট্রমা হয়ে তাড়া করতে থাকে। এই ঘটনার চার বছর পর ধর্ষণের ভুক্তভোগী সুরাইয়াকে নিয়ে তার বন্ধু বিল্টু আসেন আইনজীবী মোবারকের কাছে। সুরাইয়ার বোনের স্বামী তাকে ধর্ষণ করেন। কিন্তু মোবারক প্রথমে মামলাটি নিতে চাননি। তবে পরে তিনি মামলাটি হাতে নেন। এই মামলার বিচারকি কার্যক্রমকে ঘিরে এগিয়েছে “মোবারকনামা”র গল্প। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো।
“মোবারকনামা”য় আইনজীবী মোবারক চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম। যেকোনো চরিত্রের জন্য নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে আর কোনোকিছু বাকি নেই এই জনপ্রিয় অভিনেতার। তাই এক্ষেত্রে শুধু প্রশ্ন রাখা যেতে পারে যে, মোবারক চরিত্রে মোশাররফ করিমের চেয়ে আর কেউ ভালো করতে পারত কি-না? সেই প্রশ্নের উত্তরে কট্টর সমালোচকও নিশ্চিত একবাক্যে “না’ বলে দিবেন। প্রতিবাদ, ক্ষোভ, যুক্তি, আবেগ, বেপরোয়াভাব সবকিছু মিলিয়ে আইনজীবী মোবারককে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন মোশাররফ করিম।
সিরিজে মোশাররফ করিমের মতো জাঁদরেল অভিনেতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন শাহনাজ সুমি। উচ্ছ্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা প্রতিবাদ সবকিছু দারুণভাবে নিজের চরিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। সেই সঙ্গে যেন জানান দিয়ে রাখলেন আগামী দিনে অনেক বড় বড় তারকাকে টেক্কা দিবেন তিনি।
মোবারকনামা দিয়ে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নওরিন খান জেনির। আর নিজের ফেরাকে একটু আলাদাই করে রাখলেন জেনি। আসামি পক্ষের আইনজীবী সাবনিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। আইনজীবী হিসেবে নিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে ছিলেন সাবলীল, সেই সঙ্গে সত্য মেনে নেওয়ার মানসিকতায় জেনি ছিলেন অনবদ্য। অনেক দিন পর ফেরার ক্ষেত্রে স্নিগ্ধ রুপে মুগ্ধতাও ছড়িয়েছেন তিনি।
এছাড়া আইনজীবী মোবারকের স্ত্রী চরিত্রে স্বল্প সময় পর্দায় উপস্থিত থকালেও বরাবরের মতো নিজের সেরাটা উপহার দিয়েছেন শবনম ফারিয়া।
সুরাইয়ার বড় বোন আবিদা চরিত্রে সামিয়া অথই, এবং তার স্বামী অর্থাৎ ধর্ষণ মামলার আসামির চরিত্রে সাইদ জামান শাওন’সহ সিরেজে ছোট ছোট চরিত্রে সবার অভিনয় ছিল প্রশংসনীয়।
শিল্পীদের দুর্দান্ত অভিনয়ের পাশাপাশি মোবারকনামা’র সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো ধারালো সংলাপ। যার মাধ্যমে আঘাত করা হয়েছে সমাজের অচলায়তনে। তবে সবকিছুর পরও দর্শকদের মনে হতে পারে, কিছু কিছু বিষয় আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যেতে পারত; সিরিজটি দ্রুত শেষ করতে যেন বড্ড তাড়াহুড়ো ছিল নির্মাতার।
তবে একেবারে শেষে চমক জাগানো চেহারায় অভিনেতা রওনক হাসানের উপিস্থিতি ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে সিরিজের পরবর্তী সিজনের। নিশ্চয়ই সেখানে সমাজের আরও নানা অসঙ্গতি তুলে ধরবেন গোলাম সোহরাব দোদুল।