হালের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুনা খান। নাটক-সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি মডেলিং করে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন অসংখ্যবার। তবে এবার তিনি সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছেন বোনের প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসার অনন্য উদাহরণের কারণে।
আমাদের দেশে প্রায়ই পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নানা সংঘাতের খবর শোনা যায়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তারকাদের পরিবারেও ঘটতে শোনা যায় এমন ঘটনা। সম্প্রতি জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পপির ক্ষেত্রেও ঘটেছে এমনই এক ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ার নিয়ে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা শোনালেন রুনা খান।
আমাদের দেশে প্রচলিত নিয়মে সাধারণত বাবার সম্পত্তির ছেলেদের সমান ভাগ পান না মেয়েরা। কিন্তু গতানুগতিক সেই নিয়মের পথে না হেঁটে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন রুনা খানের ভাই তুহিন খান।
আর সেই ঘটনাই মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তুলে ধরেছেন রুনা খান। যেখানে তিনি জানিয়েছেন তাদের পরিবারের গল্পও। ফেসবুক পোস্টে ভাই তুহিন খানের সঙ্গে নিজের কয়েকটি ছবিও জুড়ে দিয়েছেন রুনা খান।
তবে তাদের এই ইতিবাচক ঘটনা নিয়ে প্রথমসারির কোনো গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করবে না বলেও রসিকতা করে কিছুটা খোঁচা মেরেছেন জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী।
তার ভাষ্য, “আমি জানি, দেশের প্রথম সারির কোন গণমাধ্যমে ‘রুনা খানের পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগ’ এই খবর ‘হেডলাইন’ হবে না! কারণ, এখানে দখল-জিডি-মামলা এসব শব্দ নেই। নেগেটিভিটি যত সহজে বিক্রি হয়, ভালো খবর তত সহজে বিক্রি হয় না। পত্রিকাওয়ালাদেরও দোষ নেই। যা লোকে খাবে, তাইতো বেচবে।”
রুনা খানের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
“তুহিন খান। বয়সে আমার দেড় বছরের ছোট,কিন্তু পড়াশুনায় ৫ বছর পেছনে। আম্মা-আব্বু আমাকে ৫ বছর বয়সে প্রাইমারী স্কুলে সরাসরি ক্লাস টু তে ভর্তি করেন। আর তাকে ৫ বছরে প্লে-গ্রুপে। কিন্ডার-গার্টেনে, ক্লাস টু উঠতে উঠতে তার বয়স ১০। আব্বু ১৯৯৮ সালে বিএডিসি থেকে গোল্ডেন-হ্যান্ডশেকে রিটায়ার করেন। আমি এসএসি পাশ করেছি মাত্র, তুহিন ক্লাস সেভেনে পড়ে! সরকারি সৎ চাকরিজীবীর ছোট্ট মহাসুখী পরিবার, অঢেল প্রাচুর্য নেই তবে আর্থিক সংকট কী জিনিস তাও জীবনে কখনো দেখিনি।
আব্বুর বেতনের টাকায় মহাসুখে খেয়ে-দেয়ে দুই ঈদে নতুন জামা-জুতো পরে কেটেছে আমাদের দুই ভাইবোনের জীবন।
আমি এইচএসসি পাশ করার পর জানতে পারলাম আব্বুর রিটায়ারমেন্টের সব টাকা শেষ, আব্বুর চোখে রেটিনা সমস্যা তিনি দেখতে পান না ঠিক মতন। কোনো কাজ বা রোজগার তিনি আর করতে পারবেন না!
সম্পদ বলতে সখিপুরে বাবার চাকরির টাকায় কেনা ২৫ কাঠা জায়গার ওপর বিশাল এক বাড়ি।
শাক-সবজি, ফলমুল, মুরগী, ডিম, গরুর দুধ, বাড়ি ভাড়া কিছুই লাগে না। সব নিজেদের। কিন্তু মাসিক কোনো রোজগার নেই।
ততদিনে আমি ইডেনে অনার্স ভর্তি হয়ে গেছি, তুহিন ক্লাস নাইনে। পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি!
টিউশনি-কোচিংয়ে পড়ানো, কুরিয়ার-সার্ভিস অফিসে চাকরি; এসব করে ঢাকায় নিজে চলি, বাড়িতে টাকা পাঠাই। সেই টাকায় ভাইয়ের লেখাপড়া, ইলেকট্রিসিটি বিল, অন্যান্য খরচ চলে!
তারপর শুরু হলো টিউশনির পাশাপাশি, অভিনয় করে উপার্জন।
এভাবেই চলছিলো সংসার।
ভাইয়ের পড়াশুনা শেষ হলো।
তারপর, ২০০৯ এ আমার বিয়ে, ভাইয়ের চাকরী-বিয়ে।
২০০১-২০০৯ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি থেকে ২০০৯-২০২৫ এমন জীবন-যাপন করছে রুনা। যেখানে তার ১ টাকা সংসারের পেছনে খরচ করতে হয় না, না নিজের সংসার, না মা-ভাইয়ের সংসার!
দায়িত্ব ফুরালো রুনাবিবির!
রয়ে গিয়েছিল সখিপুরের ২৫ কাঠার বাড়িটা!
ভাই বিক্রি করলো!
ধরুন ১০ টাকা!
ভাগ করলো, তার ৫ টাকা রেখে আমার ৫ টাকা ব্যাংকে দিয়ে গেল!
সবাই তাকে বুঝায় তুমি সাড়ে সাত টাকা পেলে তোমার বোন পাবে আড়াই টাকা; এটাই দেশের নিয়ম!
তুমি তাকে ৫ টাকা কেনো দিচ্ছো?
সে বলে, ‘আমি দেশের নিয়ম মানি না!’
আর তোমার রোজগার ১ টাকা হলে, তোমার বোনের রোজগার ১০ টাকা! তোমার ১ টাকার সম্পত্তি থাকলে, তোমার বোনের আছে ১০ টাকার সম্পত্তি! কেনো তাকে বাবার জমির ভাগ অর্ধেক দিবা?
আমার ভাই বলে, রুনার আমার থেকে ১০ গুন বেশি আছে তাই অর্ধেক দিলাম, নইলে ওকে পুরাটা দিতাম! বাপের ২৫ কাঠা জমি যে ২৫ বছর আগেই বেচে খেতে হয়নি, তার কারণ রুনা! আব্বুর রিটায়ার করার পর কোনো একটা আত্মীয়-স্বজন ১ টাকা দিয়ে সাহায্য করেনি, রুনা জীবনে ১টা টাকা কারোর কাছে সাহায্য চায়নি, ধার করেনি! ১৮ বছর বয়স থেকে টিউশনি করে নিজে চলেছে-সংসার চালিয়েছে-আমাকে মানুষ করে! এইজন্যই তো এই জমি আছে,নইলে তো জমি কবেই বেচে খেতে হতো! আব্বুর জমির পুরাটা ওর ভাগ! ওর অনেক আছে তাই ওর ভাগ থেকে অর্ধেক আমি নিলাম।”
এরপর রুনা খান লিখেছেন, “আমি যা করেছি তা এই দেশের বহু মেয়ে হয়তো পরিবারের-ভাইয়ের জন্য করে। তবে আমার ভাই যা করলো গত সপ্তাহে, তা এই দেশের কয়জন ভাই বাপের সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে বোনদের সাথে করে, তা ঠিক জানি না!
আমার থেকে শেখার তেমন কিছু না থাকলেও, আমার ভাইয়ের থেকে এ দেশের ছেলেরা শিখতে পারেন।”
রুনা খান আরও লিখেছেন, “মনে মনে হাসি আর ভাবি, অর্থ-বিত্ত-বিখ্যাত না হলেও ভাই আমার মানুষ হয়েছে। সত্যিকারের মানুষ।
সবশেষে এই অভিনেত্রী লিখেছেন, “আমি জানি, দেশের প্রথম সারির কোন গণমাধ্যমে ‘রুনা খানের পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগ’ এই খবর ‘হেডলাইন’ হবে না! কারণ, এখানে দখল-জিডি-মামলা এসব শব্দ নেই। নেগেটিভিটি যত সহজে বিক্রি হয়, ভালো খবর তত সহজে বিক্রি হয় না। পত্রিকাওয়ালাদেরও দোষ নেই। যা লোকে খাবে, তাইতো বেচবে।”