৫ আগস্টের পর মামলার আসামি যেসব শিল্পী

গতবছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আনা একটি মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে মঙ্গলবার (২০ মে) সকালে জামিন দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।

শুনানির সময় নুসরাত ফারিয়ার আইনজীবীরা আদালতে ডকুমেন্টস দাখিল করে জানান, ঘটনার সময় নুসরাত ফারিয়া কানাডায় অবস্থান করছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ওই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন পোস্টও দেন। এসব ডকুমেন্টস পর্যালোচনা করে আদালত তাকে জামিন দেন।

গত রবিবার নুসরাত ফারিয়াকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

মামলার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৯ জুলাই ভাটারা থানাধীন এলাকায় জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন এনামুল হক। এদিন আসামিদের ছোঁড়া গুলি ভুক্তভোগীর পায়ে লাগে। পরে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে এ বছরের ৩ মে মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১৭ শিল্পীসহ ২৮৩ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় নুসরাত ফারিয়া ২০৭ নম্বর আসামি। মামলায় তাকে আওয়ামী লীগের অর্থের যোগানদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বিষয়ে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজহারুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই ১৭ জন শিল্পী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতায় আওয়ামী লীগ সরকারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন বলে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।”

নুসরাত ফারিয়া ছাড়াও মামলায় আরও যেসব অভিনয়শিল্পীদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- সুবর্ণা মুস্তাফা, রোকেয়া প্রাচী, অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, চিত্রনায়ক জায়েদ খান, আশনা হাবিব ভাবনা, সোহানা সাবা, মেহের আফরোজ শাওন, জ্যোতিকা জ্যোতি, চিত্রনায়ক সাইমন সাদিক, আজিজুল হাকিম প্রমুখ।

তবে এটিই একমাত্র মামলা নয়। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আরও অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং ভাঙচুরসহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান। যিনি একাধিকবার বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

মঙ্গলবার ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আমি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছি। আমার, নুসরাত ফারিয়া ও অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।”

তিনি বলেন, “মানুষ হিসেবে যে কেউ যেকোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতেই পারেন; এজন্য কাউকে হত্যা মামলায় জড়ানো যায় না। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের অভিনেত্রী নুসরাত, সায়ন্তিকা, দেবসহ অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, কিন্তু তারা এমন মামলার শিকার হচ্ছেন না।”

জায়েদ খান আরও বলেন, “আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা ও তথ্য উপদেষ্টাকে অনুরোধ করবো, যদি কোনো দুর্নীতির অভিযোগ থাকে বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে শিল্পীরা জড়িত থাকে, তবে আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু কেন আমাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা? এটি নিছক হয়রানি ছাড়া আর কিছু নয়।”

একাধিক মামলায় জড়িয়ে অনেকে এখন আত্মগোপনে রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা শুটিং বা শোতে অংশ নিতে পারছেন না। যদি এই পরিস্থিতি চলতেই থাকে, তাহলে শিল্পীরা কীভাবে বাঁচবেন? তাদের পরিবার কিভাবে চলবে?”

তিনি আরও বলেন, “আমরা যে আওয়ামী লীগকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি এমন অভিযোগ অবাস্তব। আমরা আমাদের উপার্জনে চলি। চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন ও স্টেজ শো আমাদের আয়ের উৎস। কখনও কখনও এই উপার্জন আমাদের জীবনযাপনের জন্য যথেষ্টও হয় না।”

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জ্যেষ্ঠ শিল্পী মামুনুর রশীদ, চঞ্চল চৌধুরী, নায়ক রিয়াজ, ফেরদৌস, জায়েদ খান, শিল্পী আশনা হাবিব ভাবনা, সাজু খাদেম, রোকেয়া প্রাচী, মেহের আফরোজ শাওন, অরুণা বিশ্বাস, জ্যোতিকা জ্যোতি, শামীমা তুষ্টি, শমী কায়সার, সোহানা সাবা, ইরেশ যাকেরসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যাচেষ্টার মামলায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন- অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, সৈয়দা কামরুন নাহার শাহনূর, উর্মিলা শবনম কর, সোহানা সাবা, মেহের আফরোজ শাওন, জাকিয়া মুন, তানভিন সুইটি, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিম, আশনা হাবিব ভাবনা, সাইমন সাদিক, জায়েদ খান, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান, এবং জ্যোতিকা জ্যোতি।

বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, “আমি আমাদের শিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। ৫ আগস্টের পর কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। এখন কেবল জনপ্রিয় নামগুলোই প্রকাশ পাচ্ছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, যাদের নাম এখনও প্রকাশ পায়নি।”

সম্প্রতি, আরেক নাট্যশিল্পী সিদ্দিককে জনসমক্ষে প্রহারের পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, কারণ তার নামও একটি মামলায় রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিল্পী বলেন, “৫ আগস্টের পর আমাদের জীবন খুবই দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে; কোনো নতুন কাজ নেই, উপার্জনও নেই, বেশিরভাগ শিল্পীই নিজেদের বাঁচাতে আত্মগোপনে রয়েছেন।”