২০২৪ এ নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ 'শোগুন' - এ একটা দৃশ্য দেখে অনেক দর্শকের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। একজন সমুরাই সাদা কিমোনো পরে মাটিতে বসে আছেন। সামনে ছোট তরোয়াল রাখা। চারপাশে নীরবতা। তারপর পেটে ছুরি ঢোকানো......যন্ত্রণায় শরীর কাঁপছে, কিন্তু চিৎকার নেই। এই দৃশ্যটাই হলো 'সেপুক্কু (Seppuku)'। সিরিজ শেষ হওয়ার পরও দর্শকরা গুগল করেছেন – সেপুক্কু আসলে কী?
এই একটা শব্দ যেন জাপানের হাজার বছরের বুশিদো (যোদ্ধার নীতি) আর আজকের পপ কালচারকে একসুতোয় বেঁধে দেয়। পশ্চিমে 'হারিকিরি' হিসেবে চেনা এই রীতি আসলে সেপুক্কু - যার অর্থ 'পেট কাটা'।
শব্দের গোপন অর্থ: পেটে কেন আত্মা?
জাপানিরা বিশ্বাস করতেন, আত্মা থাকে পেটে। তাই পেট কেটে নিজেকে শেষ করা মানে নিজের আত্মাকে নিজের হাতে মুক্ত করা। সেপুক্কু শব্দটি এসেছে চীনা-জাপানি 'ক্যানজি' থেকে।
সম্মান না মৃত্যু: জীবনের চেয়ে মর্যাদা অনেক বেশি
সমুরাইদের বুশিদো (যোদ্ধার নীতি) নীতিতে একটা কথা খুব স্পষ্ট ছিল- সম্মান হারানোর চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো। যুদ্ধে হেরে গিয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়লে অপমান, নির্যাতন আর পুরো পরিবারের ধ্বংস অবধারিত ছিল। সেপুক্কু ছিল সেই লজ্জা থেকে বাঁচার পথ। নিজের হাতে মৃত্যু বেছে নিয়ে তারা দেখাতেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা সক্ষম এবং যন্ত্রণা সহ্য করেও মাথা উঁচু করে তারা মরতে পারে।
শোগুন সিরিজে যেভাবে দেখানো হয়, ঠিক তেমনি এটা ছিল চরম আত্মসম্মানবোধের প্রকাশ। আজকের সময়ে আমরা ছোট ছোট কথায়, সমালোচনায় বা সোশ্যাল মিডিয়ার একটা কমেন্টে ভেঙে পড়ি। কিন্তু সমুরাইদের কাছে সম্মান ছিল জীবনের থেকেও দামি।
শাস্তি না আত্মত্যাগ: রাজার শেষ অনুগ্রহ
প্রথম দিকে সেপুক্কু ছিল সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় আত্মত্যাগ করা। কিন্তু ১২শ শতাব্দী থেকে এটা ধীরে ধীরে শাস্তির রূপ নেয়। কোনো সমুরাই বড় অপরাধ করলে (যেমন: প্রভুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বা যুদ্ধে পরাজয়) রাজা বা শোগুন তাকে সেপুক্কু করার আদেশ দিতেন।
এটা কেন? কারণ সাধারণ অপরাধীর মতো ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা ছিল চরম অপমান। কিন্তু সেপুক্কু করলে তিনি নিজের হাতে মৃত্যু বেছে নিতে পারতেন এবং মরেও সম্মানের সঙ্গে যেতে পারতেন। তাই সমুরাইদের কাছে এটাকে রাজার শেষ অনুগ্রহ বলে মনে করা হতো। শাস্তি হলেও আত্মসম্মান বেঁচে যেত। শোগুন সিরিজেও দেখা যায়, কীভাবে সেপুক্কু একই সঙ্গে শাস্তি এবং আত্মসম্মান রক্ষার উপায় হয়ে উঠত।
সেপুক্কু কেমন করে করা হতো?
সেপুক্কু ছিল থিয়েটারের মতো।
- সাদা কিমানো পরা, স্নান, শেষ খাবার আর মৃত্যুর কবিতা লেখা।
- পেটের বাম দিক থেকে ডান দিকে (কখনো আকারে ‘X’ আকৃতিতে) ছুরি চালানো।
- কাইশাকুনিন (সহকারী) দাঁড়িয়ে থাকতেন। যন্ত্রণা বেশি হলে এক কোপে মাথা কেটে দিতেন।
আজকের জাপানে সেপুক্কুর ছায়া
১৮৭৩ সালে মেইজি সরকার আইন করে সেপুক্কু বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা আরও বিরল হয়ে যায়। কিন্তু সম্মান, লজ্জা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের যে ধারণা এর মধ্যে ছিল, সেটা এখনো জাপানি সমাজে রয়ে গেছে। শোগুনের মতো সিরিজের কারণে নতুন প্রজন্ম আবারও এই প্রাচীন রীতি নিয়ে জানতে আগ্রহী হয়েছে।
সেপুক্কু আসলে শুধু মৃত্যুর গল্প নয়- এটা মানুষের আত্মসম্মানবোধ এবং যন্ত্রণা সহ্য করার অসাধারণ শক্তির গল্প।